হঠাৎ করেই দেশে একটি গুমোট পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিভিন্ন স্থানে বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধার, পুলিশের উচ্চ সতর্কবার্তা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা কি নতুন কোনো অশনিসংকেতের ইঙ্গিত দিচ্ছে? সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্ন উঠছে। গণ অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির আগে দেশজুড়ে অজানা আতঙ্ক আর উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কেন এমন পরিস্থিতি? এর পেছনে কি কোনো ষড়যন্ত্র আছে?


দেশজুড়ে পুলিশের ব্যবহৃত যানবাহনকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত শনিবার (১ আগস্ট) এক জরুরি বার্তায় এ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দফতরের অপারেশন্স কন্ট্রোল।


উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের জিপ, পিকআপ, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর হামলা চালাতে পারে, গোয়েন্দা সংস্থার এমন তথ্যের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ডিউটির সময় এবং ডিউটি শেষে পার্কিং করা যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


এতে বলা হয়, ডিউটিরত কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামানোর প্রয়োজন হলে সেটি অবশ্যই নিরাপদ স্থানে পার্ক করতে হবে এবং পুলিশের সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া যানবাহন ফেলে রাখা যাবে না। অর্থাৎ আনঅ্যাটেন্ডেড (Unattended) অবস্থায় কোনো পুলিশি যানবাহন রাখার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।


এ ছাড়া ডিউটি শেষে থানা, পুলিশ লাইন্স, অফিস কম্পাউন্ড কিংবা অন্যান্য নির্ধারিত স্থানে রাখা সব সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তাও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব স্থানে নিয়মিত টহল, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু শনাক্তে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।


পুলিশ সদর দফতর বার্তায় বিষয়টিকে ‘অতীব গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করে দেশের সব মহানগর, রেঞ্জ, জেলা ও ইউনিটের কর্মকর্তাদের নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে যখন এই সতর্কবার্তা দেয়া হয় তার আগে কয়েকদিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বোমা সদৃশ বস্তু নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধারের সাম্প্রতিক ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল জানিয়েছে সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক ছিল না। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন, এবং মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা উল্লেখযোগ্য। এটা কারা, কেন করছে তা নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। 


পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্যই পরিকল্পিত ভাবে এসব করা হচ্ছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব ঘটনা টেস্ট কেস। অপরাধীরা এ ধরনের বস্তু নিরাপদে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ফাঁকফোকর গুলো খুঁজে বের করে। বিমানবন্দর, মেট্রো রেল অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় কিভাবে এসব রাখা হচ্ছে? এটা অবশ্যই একটা বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। এসব রেখে অপরাধীরা বড় কোনো নাশকতার ছক তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। তাই এসব বোমা সদৃশ বস্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। যদিও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বোমা-আতঙ্ক ও সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনার মধ্যে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকতে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম। কিন্তু পুলিশের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি আনতে পারেনি।


সাম্প্রতিক সময়ে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি ঘটেছে। রাজধানীতে ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। কখনো প্রকাশ্য দিবালোকে, কখনো শত শত মানুষের সামনে গুলি করে কেড়ে নেয়া হচ্ছে মানুষের তাজা প্রাণ। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসেই মোট ৩২৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই এক মাসে ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে।


গত একমাসে দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। হামলা-পাল্টা হামলা, মামলা-পাল্টা মামলার ঘটনা ঘটে। রাজনীতিতে আবার আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার এবং প্রতিপক্ষকে নোংরা কথা বলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে বিরোধী রাজনৈতিক দল-জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপি। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দল দু’টির শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার সম্পর্কে বিষোদগার করছে। বিশেষ করে জুলাই যাত্রায় বিভিন্ন এলাকায় এনসিপির নেতাকর্মীরা হামলা-মারধরের শিকার হওয়ায় রাজনীতিতে উত্তপ্ত বাতাস লেগেছে। জামায়াত-এনসিপি বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কেন তুলনা করছে তা নিয়ে প্রশ্ন জনমনে। বিরোধীদল মাত্র ছয় মাস বয়সী সরকারের বিরুদ্ধে কেন এত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিরোধীদের তৃতীয় কোনো পক্ষ উসকানি দিচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নও উঠছে। কারণ কদিন আগেই সংসদে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে সমঝোতা এবং সহমর্মিতার আবহ ছিল তা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল কেন? এর পেছনে কি অন্য পক্ষের হাত রয়েছে? রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে সবক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা।


দেশের সার্বিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক সহাবস্থান জরুরি। রাজনৈতিক বিভাজন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন অবনতি ঘটায় তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে। সার্বিক ভাবে ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে এই অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার সকল মহলের সহযোগিতা। কিন্তু সরকার সেই সহযোগিতা পাচ্ছে না। জাতীয় স্বার্থে দেশের সব রাজনৈতিক দল এখনও মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। দেশের স্বার্থে দলীয় স্বার্থকে আপাতত বাদ দেয়ার উদারতা দেখাতে পারেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অসহিষ্ণুতার কারণে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। দেশে এখন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, তার কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। যখন রাজনৈতিক দলগুলো হানাহানি ও পাল্টাপাল্টি আক্রমণ করে তখন অপরাধীরা সুযোগ পায়।  ষড়যন্ত্রকারীরা ডালপালা বিস্তার করে। এরকম রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে। এমনিতেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। বিগত দেড় বছরে ইউনূস সরকার দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। বেকারত্ব বেড়েছে, বিনিয়োগ কমেছে। বেসরকারি খাত অচল প্রায়। অর্থনীতির কোনো সূচকেই আশানুরূপ উন্নতি নেই। বর্তমান সরকার একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে দেশকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। এইসময় এ ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট বাড়াচ্ছে। এরফলে সার্বিক ভাবে দেশ হচ্ছে অস্থিতিশীল। এরকম পরিস্থিতিতে অগণতান্ত্রিক শক্তি সুযোগ নেয়। প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্র বিরোধী শক্তি কি পরিকল্পিত ভাবে দেশে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে? একারণে তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে আবারও বিভক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা যদি অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখবো, পর্দার আড়ালে একটি গণতন্ত্র বিনাশী শক্তির ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ বারবার পিছিয়ে গেছে। যখনই দেশে গণতন্ত্র এসেছে তখনই চক্রান্ত হয়েছে। এবারও তেমন কিছু হচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি সরকার, বিরোধীদল এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে এখন ধৈর্য্য ধরতে হবে। সহনশীল আচরণ করতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্য এবং সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। গণতন্ত্রকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। আগস্টের অভ্যুথান আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়। তাই মনে রাখতে হবে, ঐক্যই আমাদের মূল শক্তি। রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রশ্নে। জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের বিকল্প নেই। বিভক্ত হলে বিপন্ন হবে গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার।