স্কুলব্যাগ কাঁধে, টিফিন বক্সে মায়ের দেওয়া খাবার নিয়ে সকালে স্কুলে এসেছিল শিক্ষার্থীরা। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সহপাঠীদের সঙ্গে খুনসুটিতে ভালোই কাটছিল সময়। কিন্তু বেলা সোয়া ১টার দিকে আগুনের লেলিহান শিখায় বদলে যায় সব। হঠাৎ এক প্রশিক্ষণ বিমান ছিটকে এসে পড়ে স্কুল ভবনের সিঁড়ির সামনে। আগুনে ঝলসে যায় ছোট্ট শিশুদের কোমল শরীর। তাদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান শিক্ষক, অভিভাবকরাও। গত বছরের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় ২৮ শিক্ষার্থী, তিন অভিভাবক, তিন শিক্ষক, একজন আয়াসহ মোট ৩৫ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৭০ জন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক। দুর্ঘটনায় স্কুলের দক্ষিণ পাশের পুরোনো ভবনের নিচতলা ও দোতলার বিভিন্ন কক্ষ বিধ্বস্ত হয়। দুঃসহ এই স্মৃতি মনে হলে এখনো আঁতকে ওঠে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। আজ সেই বীভৎস-ভয়াবহ ২১ জুলাই।


দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখনো অনেক শিক্ষার্থী ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে। বীভৎস এ ঘটনার এক বছর পার হলেও মনে রয়ে গেছে সেই ক্ষত। মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে ফিরেছে শিক্ষার্থীদের কোলাহল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ফিরেছে তার চেনা ছন্দে। কিন্তু এক বছর আগে যে প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল মৃত্যু, ধ্বংস আর আতঙ্কের জনপদে, সেখানে এখনো যেন অদৃশ্য এক ভারী নীরবতা। ছাত্রছাত্রীরা এখনো নির্বাক তাকিয়ে থাকে ভবনটির দিকে। তাদের চোখমুখে এখনো বিষাদ-আতঙ্কের ছাপ কাটেনি। যেন এক বছর আগের সেই ভয়াবহ দুপুরের স্মৃতি এখনো মুছে যায়নি। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনায় গতকাল দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মাইলস্টোন কলেজ কর্তৃপক্ষ। এতে অংশ নেয় নিহত শিক্ষার্থীদের সহপাঠী, শিক্ষকসহ স্বজনেরা। এ ছাড়া আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। আজও প্রতিষ্ঠানটিতে দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। সরেজমিন ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, বিমান দুর্ঘটনার ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। চারদিকে উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভবনটি ভাঙার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সেদিনের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণা করে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সূর্য সময় বিশ্বাস জানায়, যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সে ও তার সহপাঠীরা দোতলার একটি কক্ষে আটকা পড়েছিল। চারদিকে আগুন, ধোঁয়া ও আহত বন্ধুদের আর্তনাদে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ পরিবেশ। শিক্ষকরা লোহার গ্রিল ভেঙে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন।


শিক্ষার্থী তাবাসসুম খানম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর থেকে বিমান দেখলেই ভয় লাগত, এখন তা কিছুটা কমেছে। বিমান দুর্ঘটনার কথা মনে পড়লে মনটা খারাপ হয়ে যায়। যারা আমাদের সঙ্গে ছিল, তারা আর নেই।’ এক বছর পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরন নবী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিমান দুর্ঘটনায় আমরা সন্তানতুল্য শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক-অভিভাবককে হারিয়েছি। সেই শোক কাটিয়ে ছাত্রছাত্রীদের স্বাভাবিক করতে আনন্দের সঙ্গে পাঠদানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ শিক্ষার্থীরা সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।