রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাসের জন্য ২০৫ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয় ২০২৩ সালের জুনে। যে জায়গাটি বরাদ্দ করা হয় সেটি প্রায় বনাঞ্চল। ওই সময় জেলা প্রশাসন এবং বন বিভাগ যৌথ জরিপ করে ওই জমিতে থাকা ২৫ হাজার ৮৪২টি ফলদ ও বনজ গাছ তালিকাভুক্ত করে। অধিগ্রহণ করা জমিতে ভবন অবকাঠামো তৈরি করতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মাটি ও বালু ভরাটের কাজ শুরু হয়। ভরাটের কাজ শুরু হলেই বন বিভাগের অনুমতি এবং নিলাম ছাড়াই কৌশলে গোপনে গাছ কাটা শুরু হয়। এ সময় আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি, নিম, অর্জুন, কড়ই, তেঁতুল, সেগুনসহ মূল্যবান গাছ গোপনে বিক্রি করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও কাগজে কলমে তিন দফায় মোট ২ হাজার ৬৪২টি গাছ বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১ হাজার ৮৫৩টি গাছ ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় বিক্রি হয় ৭১৩টি গাছ নিলামে বিক্রি করা হয়। সর্বশেষ মে মাসে তৃতীয় দফায় ৭৬টি গাছ নিলাম হয়। সরকারি তালিকাভুক্ত গাছের সংখ্যা থেকে নিলাম ও বিদ্যমান গাছ বাদ দিলে ২২ হাজার ৭০০টি গাছ থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে শ খানেক গাছের অস্তিত আছে। অর্থাৎ প্রায় সব গাছই কেটে ফেলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে রামেবি উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক দাবি করেছেন, নিয়ম মেনে যেসব গাছ ক্যাম্পাসের জন্য প্রয়োজন, সেগুলো কাটা হয়েছে। বাকি গাছ আছে। পরিবেশকর্মী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গাছ না কেটে কীভাবে ভবনগুলো নির্মাণ করা যায়, সেটি বিবেচনা করতে গণপূর্ত বিভাগকে অনুরোধ করেছিলাম। তারা আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পরেই গাছগুলো নিলামের মাধ্যমে কেটে ফেলা হয়। আর রামেবি যে গাছগুলো কেটেছে তাতে যেন রাজশাহীর ফুসফুসেই আঘাত হেনেছে। শুধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করতেই নয়। উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত গাছ কাটা হচ্ছে রাজশাহীতে। অথচ রাজশাহীকে এক সময় ‘সবুজের শহর’ বলা হতো। প্রশস্ত সড়কের দুই পাশে ছিল শত শত রেইনট্রি, কাঠবাদাম, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু ও নানা প্রজাতির ছায়াদানকারী গাছ। শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, তীব্র গরমের শহরটিকে বাসযোগ্য রাখত। কিন্তু উন্নয়নের নামে সেই সবুজ আজ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। সড়ক প্রশস্তকরণ, ড্রেনেজ, ইউটিলিটি লাইন, সরকারি ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে নির্বিচারে কাটা হয়েছে গাছ।
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মে থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক বছরে রাজশাহী জেলায় ২৩ হাজার ৪১টি গাছ কাটা হয়েছে। একই সময়ে দেশে মোট বৃক্ষনিধনের সংখ্যা ছিল ৫২ হাজার ৩৭৫টি। অর্থাৎ মোট বৃক্ষনিধনের প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে রাজশাহীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথভাবে সবুজ ও জলাবদ্ধতা নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় রাজশাহী মহানগরীতে গত পাঁচ বছরে ২৬ শতাংশ সবুজ গাছ কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যার ফলে আগামীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজশাহী ওয়াসার ভূপৃষ্ঠস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্পের আওতায় গাছ কাটা হয়েছে গত বছর। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে গাছ কাটা হয়েছে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপনের জন্য। পদ্মা নদী থেকে মহানগরীতে পানি আনার জন্য ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার প্রকল্পের অংশ হিসেবে সঞ্চালন লাইনের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে কমপক্ষে এক হাজারের বেশি গাছ কাটা হয়েছে। যদিও সড়ক ও জনপথ বিভাগের দাবি ৪১৮টি গাছ কাটা হয়েছে।
রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী বৃক্ষরোপণবিদ মীর মুকুট মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘রাজশাহী ওয়াসার জমি অধিগ্রহণের জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ না থাকায় প্রকল্পটি সওজ জমিতে হওয়ায় গাছ কাটা জরুরি হয়ে পড়ে। ওয়াসা যখন প্রকল্পটি হাতে নেয় তখন জমি অধিগ্রহণের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তারা সওজের জমির কথা মাথায় রেখে প্রকল্পটি পরিকল্পনা করেছিল। পাইপলাইন স্থাপনের জন্য মহাসড়কের পাশের গাছগুলো কেটে ফেলতে হয়েছে।’ রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মামুদ জানান, গাছগুলো না কাটলে পাইপলাইন বসানো সম্ভব ছিল না। গণপূর্ত বিভাগ রাজশাহী সার্কিট হাউস কম্পাউন্ডে ৫২টি গাছ কেটে ছয় তলা ভবন, চার তলা ব্যারাক এবং একটি রান্নাঘর ব্লক তৈরি করছে। পরিবেশকর্মীরা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাতে কোনো লাভ হয়নি। সম্প্রতি রাজশাহী নগরীর রাজীব চত্বর থেকে কলাবাগান হয়ে ঘোষপাড়া মোড় পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণের জন্য ৩০টি পরিণত কাঠবাদাম গাছ কেটে ফেলা হয়। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন নগরীতে আড়াই লাখ গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাছ রেখে কীভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, তারা সেদিকে খেয়াল রেখেই কাজ করছেন।