পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে এবার হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ভারতীয় ক্রু মেম্বার নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও আটজন। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘোষণা দেন তিনি। এদিকে গতকালও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। জবাবে কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি জাতীয় তেল ট্যাংকারে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ভয়াবহ ও অনাকাক্সিক্ষত হামলায় ট্যাংকারে কর্মরত এক ভারতীয় ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন আরও আটজন ক্রু সদস্য। তাদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় এবং দুইজন ইউক্রেনের নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জানা গেছে, ওমান জলসীমার মধ্যে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ শিপিং লেনে ট্রানজিট করার সময় আমিরাতের জাতীয় মালিকানাধীন তেলের ট্যাংকার ‘মম্বাসা’ ও ‘আল বাহিয়া’ লক্ষ্য করে ইরান এই প্রাণঘাতী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিক্ষেপ করে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে বর্তমানে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক চরম প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধাবস্থা চলছে। গতকাল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায়ের ঘোষণা দেন তিনি। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরাই এটি পাহারা দেব। পাহারা দেওয়ার জন্য আমরা অর্থ পাব।’
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে ইরান। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের একটি চুক্তি ছিল। তারা সব সময়ই তা ভঙ্গ করে। আমরা তাদের ওপর খুব কঠোর আঘাত হানব। সম্ভবত আমরা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেব!’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরাই এর অভিভাবক হব। আর এজন্য আমাদের অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।’
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিবাদের পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল ইরানের বন্দর আব্বাস ও বুশেহর শহরে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, বুশেহরে চারটি জায়গায় হামলা হয়েছে। অপরদিকে বন্দর আব্বাসে পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
পাল্টা জবাবে কুয়েতের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার করে কুয়েতে মার্কিন বাহিনীর জ্বালানি ভান্ডার, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগকেন্দ্র এবং গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে ওই ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
একই সময়ে ইরানের নৌবাহিনী জানায়, মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে উপকূলীয় এলাকা থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
সৌদির বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা : চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সোমবার তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি বিমানবন্দরে সৌদির চালানো হামলার জবাবে এই পাল্টা হামলা চালায় ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।
হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাঁরা সৌদি আরবের দক্ষিণের পার্বত্য অঞ্চলের প্রাদেশিক রাজধানী আবহার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেন সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটিতে অনেক সৌদি নাগরিক গ্রীষ্মের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে বেড়াতে যান। তবে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সৌদি আরব মাঝ আকাশেই প্রতিহত করেছে।
এর আগে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতি গোষ্ঠী অভিযোগ করে, সৌদি আরব ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে ও তারা এর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে। হুতিরা সোমবারের এই হামলাকে নগ্ন আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করে বলে, এর মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।