যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা পঞ্চম দিনের মতো মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়েছে, আর এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।
এ অবস্থায় গত জুনে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সমঝোতা স্মারক কার্যত ভেঙে পড়েছে। উভয় দেশই ঘোষণা করেছে, ওই সমঝোতা আর কার্যকর নয়। তবে একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
এমন পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান দুই পক্ষকে অবিলম্বে হামলা বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, “স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির জন্য সংলাপ, কূটনীতি ও ধারাবাহিক সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই।”
যদিও প্রকাশ্যে দুই দেশের নেতারা আপসের বিষয়ে অনাগ্রহী অবস্থান দেখাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান শান্তিচুক্তির জন্য মরিয়া হলেও তিনি তেহরানের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না।
অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্বের লড়াইয়ে রয়েছে। তাই শান্তি চুক্তি মেনে চলার আর কোনও কারণ নেই।”
তবে প্রশ্ন উঠছে- দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আদৌ কার বেশি?
ইরানের ওপর অর্থনীতি ও সামরিক চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার ওপর নতুন করে বড় আঘাত হেনেছে।
নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর অন্যতম ইরান। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল রফতানি, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ এবং বিদেশে থাকা সম্পদ ব্যবহারে দীর্ঘদিন ধরেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এর ফলে ২০১২ সালে মাথাপিছু জিডিপি যেখানে ছিল প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার, তা ২০২৪ সালে নেমে এসেছে প্রায় ৫ হাজার ডলারে। একই সময়ে দৈনিক তেল রফতানি ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ব্যারেলে।
গত জুনে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর ইতিবাচক প্রভাবে ইরানি রিয়ালের মূল্য একদিনেই প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল।
কিন্তু চলতি সপ্তাহে আবারও নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করায় ইরানের অর্থনীতি নতুন করে চাপে পড়েছে।
ক্ষয় হয়েছে সামরিক সক্ষমতাও
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ধাপেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ড্রোনের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহৃত বা ধ্বংস হয়েছে।
এছাড়া নৌঘাঁটি, বন্দর, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং সামরিক স্থাপনাগুলোও একাধিক হামলার শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে।
সম্প্রতি মার্কিন হামলায় কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন গ্রেটার তুনব দ্বীপসহ একাধিক সামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আঞ্চলিক সম্পর্কেও চাপ
ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের ভূখণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৯টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থিত।
ইরান দাবি করছে, তারা কেবল মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। তবে বাস্তবে কিছু হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো যৌথভাবে সামরিক তথ্য আদান-প্রদান ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রও চাপে
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ওয়াশিংটনও বিভিন্ন দিক থেকে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে।
তেলের দাম বৃদ্ধি
সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইরানের অবরোধের ফলে সেই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার, তা মে মাসে বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছায়।
নির্বাচনী রাজনীতির চাপ
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমছে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতিকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মত দিয়েছেন।
এদিকে নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই যুদ্ধ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন জরিপে ইতোমধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
অস্ত্রের মজুদও কমছে
সিএসআইএসের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ এখনও সংকটজনক পর্যায়ে না পৌঁছালেও দ্রুত কমছে।
ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সাত ধরনের অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্রের মধ্যে অন্তত চারটির অর্ধেকের বেশি মজুদ প্রথম দফার যুদ্ধেই শেষ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠনে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এছাড়া যুদ্ধে ইতোমধ্যে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪১৪ জন আহত হয়েছেন বলে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে কি আলোচনায় ফিরবে দুই দেশ?
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহের মতে, অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও ইরান এই যুদ্ধকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। ফলে শুধু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তেহরান আপস করবে- এমন সম্ভাবনা কম।
তার ভাষায়, “প্রায় ৪৭ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরান টিকে আছে। তাই শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তাদের নতি স্বীকার করানো সহজ নয়।”
তিনি আরও বলেন, দুর্বলতার বার্তা দিতে চায় না ইরান। তাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা নতুন কোনও চুক্তিতে আগ্রহী হবে না।
অন্যদিকে নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক ব্রায়ান ফিনুকেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ শুধু ইরান যুদ্ধের জন্য নয়; ভবিষ্যতে চীনের মতো শক্তিধর প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির সঙ্গেও এটি জড়িত।
কার ক্ষতি বেশি?
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ দুই দেশের জন্যই ব্যয়বহুল। ইরান অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার চাপে রয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক চাপ এবং অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ।
তবে অধ্যাপক আলম সালেহের মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির।
তার ভাষায়, “চীন ও রাশিয়া দেখছে, সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সহজে দমাতে পারছে না। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, মধ্যম শক্তির একটি দেশের বিরুদ্ধেও মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে দুই পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। ফলে শেষ পর্যন্ত নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার চাপ ওয়াশিংটন ও তেহরান- উভয়ের ওপরই বাড়তে পারে।