মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বালুচরে আবারও বারুদের গন্ধ। ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যেন কেবল একটি মিথ্যে আশ্বাস ছিল। এটা ধূলিসাৎ হতে সময় নিল মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ঘোষণা করলেন যে এই যুদ্ধবিরতি আর নেই, তখন বিশ্ববাসী নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে উঠল। অথচ অবাক করার বিষয় হলো, এর ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোতেই হোয়াইট হাউসের সুর পাল্টে গেল! তারা দাবি করল, বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ইচ্ছা তাদের নেই। এই স্ববিরোধী অবস্থানই যেন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চিরাচরিত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে ইরানকে ঘিরে মার্কিন নীতি কেবল বিশাল বড় বড় বুলি আর সীমিত সামরিক পদক্ষেপের গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে আছে। হোয়াইট হাউস আজ অবধি ঠিক করতে পারেনি তারা আসলে কী চায়; শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিনাশ, নাকি হরমুজ প্রণালীতে নির্বিঘ্ন নৌচলাচল?
ফেব্রুয়ারি মাসে যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর হামলা চালানো হলো, তখন ওয়াশিংটন ভেবেছিল এটিই বুঝি চূড়ান্ত আঘাত। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। সেই হত্যাকাণ্ডের রেশ ধরে ইরানের কট্টরপন্থীরা বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। আর তেহরান এখন হরমুজ প্রণালিতে সেই চিরচেনা ‘অপ্রতিসাম্য’ আক্রমণের কৌশল নিয়ে মার্কিন বাহিনীকে আবারও টেনে নামাচ্ছে এক অন্তহীন যুদ্ধের চোরাবালিতে।
এই উত্তেজনার আঁচ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই বরং এর মাসুল গুনছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট দেশগুলো। বাহরাইনের আকাশে এখন প্রতিধ্বনি তোলে এয়ার-রেইড সাইরেনের আর্তনাদ, আর কুয়েত বা কাতার বিনা দোষে নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে খুঁজে পাচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিও আজ এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জ্বালানি তেলের দাম যেন এক মরণফাঁদ। এদিকে, ওয়াশিংটনের অন্দরমহলে এক অদ্ভুত বাস্তবতা; ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কৌশলগত স্বার্থগুলো যেন বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকরা কেউই সাহস করে প্রশ্ন করছেন না যে, এক অঞ্চলের মিত্রের জেদ রক্ষা করতে গিয়ে আর কতকাল মার্কিন অর্থনীতি আর সামরিক সক্ষমতাকে তিলে তিলে ক্ষয় হতে দেওয়া হবে। আজকের এই গোলযোগ কেবল একটি দেশের ওপর হামলা বা পাল্টা হামলার গল্প নয়; এটি এমন এক যুদ্ধের ইতিহাস যেখানে কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো শেষ গন্তব্য নেই। আছে কেবল আগামী পাঁচ বছর ধরে এই একই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার এক অন্ধ জেদ।
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা কি একবারও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করেছেন, এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?