যুদ্ধরিবতি ভেঙে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল নতুন করে ইরানের অন্তত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতের ৮৫ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে। হামলার কারণ হিসেবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এ হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ইসলামাবাদ চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে পিছু না হটার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার ইরানের সিরিক বন্দরনগরী, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং খারগ দ্বীপসহ কৌশলগত ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে গাইডেড ‘নিখুঁত অস্ত্র’ দিয়ে আঘাত হানার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সবশেষ দফার হামলা করা হয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার সাইট এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি এবং এর কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ৬০টিরও বেশি ছোট নৌকায়ও আঘাত হানা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দরনগরী, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস এবং খারগ দ্বীপসহ কৌশলগত বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ঘটেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির খবরে বলা হয়েছে, অধিকাংশ হামলা বেসামরিক এলাকাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে এবং সিরিক বাণিজ্যিক জেটিতে একটি প্রজেক্টাইলের টুকরোয় কয়েকজন আহত হয়েছেন।


জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের নৌ ও বিমান বাহিনী যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ৮৫ সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। আইআরজিসি জানায়, হরমুজগান ও মাহশাহরের উপকূলীয় ঘাঁটি এবং বেসামরিক স্টেশনগুলোয় মার্কিন আকাশ হামলার জবাবে এটি তাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলাকে যুদ্ধবিরতি ও ইসলামাবাদ চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল বলে দাবি করেছে তারা। ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় মার্কিন এ হামলাগুলোকে ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঐতিহাসিক শোক ও বিদায় শোভাযাত্রার ঐতিহাসিক ঘটনাকে ম্লান করার চেষ্টা বলেও অভিযোগ করে আইআরজিসি।


পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ইসলামাবাদ চুক্তির ব্যর্থতার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার।


তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) শেষ হয়েছে। তাদের সঙ্গে কাজ করা কেবল সময়ের অপচয়। আমরা গত রাতে ইরানের ওপর খুব কঠোর আঘাত করেছি। তাদের বলেছিলাম, প্রতিবার যখন তোমরা আঘাত করবে, আমরাও পাল্টা আঘাত করব এবং অবশ্যই তারা নোংরা খেলোয়াড়, তাই তারা সবার পেছনে লাগে।


ট্রাম্প বলেন, আমরা তাদের পছন্দ করি না। তারা মন্দ লোক এবং এটি ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়। আর আমরা একে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করব।


অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও আলোচক দলের প্রধান বাঘের গালিবাফ জানান, আমরা পিছু হটা বা আত্মসমর্পণ করার পাত্র নই। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর উল্লেখ করে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, দাদাগিরি এবং ব্ল্যাকমেলের দিন শেষ। আপনারা কোথাও পৌঁছাতে পারবেন না।


গালিবাফ দাবি করেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, নতুন করে সামরিক হামলার ক্রমাগত হুমকি, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ, তেল খাতের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন ও হামলা-এর সবই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ১৪ দফার সমঝোতার লঙ্ঘন।


গাজায় ফের ইসরায়েলি হামলা, নিহত সাত : গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও দখলদার ইসরায়েলের হামলায় অন্তত সাত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদলু এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাজা সিটির দক্ষিণের সাবরা এলাকার বার্সেলোনা পার্কের পুবদিকে একটি বেসামরিক গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন।


খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে একজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত অবস্থায় আরও নয়জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মধ্য খান ইউনিসের জোরাত আল-আক্কাদ এলাকায় ড্রোন হামলায় আরও একজন নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন। একই এলাকার বির জানুন ও আল-শায়ের এলাকায় পথচারীদের লক্ষ্য করে চালানো আরেকটি ড্রোন হামলায় ৩০ বছর বয়সি এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এতে চার শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে রাফাহর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুয়াবিয়া এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, একটি ইসরায়েলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন ওই এলাকায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর আগে, মঙ্গলবার সকালে গাজা সিটির বন্দরের কাছে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি তাঁবুতে ড্রোন হামলায় ৪৬ বছর বয়সি এক ফিলিস্তিনি নিহত হন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।


ইরানের তেল রপ্তানির ওপর ফের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনার পর ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এ ঘটনার জন্য তাদের কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে।


তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া ভঙ্গুর চুক্তির অংশ হিসেবে মার্কিন অর্থ বিভাগ গত মাসে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের তেল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার সেই অনুমোদন প্রত্যাহার করায় সময়সীমা কমে ১৭ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।