মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে আবারও যেন যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে তীব্র হয়ে উঠেছে উত্তেজনাও ।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে তেহরানের বিস্তৃত নগরজুড়ে এবং আলবোরজ পর্বতমালার বরফঢাকা চূড়াগুলোর পেছনে অন্ধকার নেমে এলে হাজারো মানুষ নিয়মিতভাবে রাষ্ট্র-সমর্থিত সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে কেন্দ্র করে জনমত সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।
তেহরানের অভিজাত এলাকা তাজরিশ স্কয়ারের কাছে প্রতিদিনের মতোই শোনা যায় ‘যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক’ স্লোগান। ইরানের জাতীয় পতাকার সমুদ্রে ভাসতে থাকা জনতার ভিড়ে উৎসাহী বিক্রেতারা চা, স্মারক সামগ্রী, দেশপ্রেমমূলক ক্যাপ ও ব্যাজ বিক্রি করছেন।
ইরানের পতাকার রঙে সাজানো চশমা পরা টিয়ানা নামে এক তরুণী বলেন, “আমি আমার দেশ ও জনগণের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।”
উচ্চস্বরে চলা স্লোগানের মধ্যেই তিনি আরও দাবি করেন, “আমাদের সেনাবাহিনী, সব কমান্ডার- সবাই নিজেদের জীবন দিতে প্রস্তুত, পূর্ণ মন-প্রাণ দিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত।”
তিনি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া হুমকিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, “ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তারা দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তাদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে বলেন, ইরানকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যথায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে- যা চলমান শান্তি আলোচনা ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
তাজরিশ স্কয়ারে উপস্থিত এক প্রবীণ ব্যক্তি হাতে লেখা একটি পোস্টার দেখিয়ে বলেন, “পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আমাদের সীমান্তের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তা রক্ষা করব।”
তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, “আমাদের পারমাণবিক বোমা দরকার নেই, আমাদের দরকার পরিচ্ছন্ন শক্তি ও বিদ্যুৎ।”
তিনি আরও দাবি করেন, “ট্রাম্প জানেন আমাদের কাছে পারমাণবিক বোমা নেই, তবুও তিনি আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।”
যুদ্ধের আশঙ্কা ও জনমনে অনিশ্চয়তা
ইরানজুড়ে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হতে পারে- এমন জল্পনা ও উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক মানুষের মধ্যেই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা যেকোনও সময় শুরু হতে পারে।
লন্ডন ও দুবাইয়ে বড় হওয়া ফাতিমা বলেন, “আমরা জানি এই যুদ্ধ শেষ হয়নি। ট্রাম্প আসলে আলোচনায় বিশ্বাস করেন না।”
তার মতে, “তিনি হয়তো বলবেন- তোমরা যা বলি তাই করো, না হলে আমি তোমাদের হত্যা করব- তারপর চুক্তি হলেও আক্রমণ করবে।”
রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত এসব সমাবেশকে ‘নাইট গ্যাদারিংস’ বলা হচ্ছে, যা প্রায় তিন মাস ধরে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এসব কর্মসূচি জোরদার হয়েছে।
সাধারণ নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণের চিত্র
সাম্প্রতিক দিনে আরও একটি চিত্র সামনে এসেছে- সার্বজনিক স্থানে ‘গান কিওস্ক’ বা অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্র চালানোর প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
ভানাক স্কয়ারের একটি কিওস্কে দেখা যায়, কালো চাদর পরা এক নারীকে একটি একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে এক মুখোশধারী সেনা পোশাক পরা ব্যক্তি তাকে অস্ত্র খুলে আবার জোড়া লাগানো বা গোছানো শেখাচ্ছেন।
কিছু দূরে দেখা যায়, একটি ছোট মেয়ে খালি কালাশনিকভ হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তাক করে ট্রিগার চাপার ভান করছে, এরপর হাসিমুখে অস্ত্রটি প্রশিক্ষকের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অস্ত্র প্রদর্শন
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও সাম্প্রতিক সময়ে অস্ত্র প্রদর্শনের দৃশ্য দেখা গেছে। কয়েকটি চ্যানেলে উপস্থাপকরা সম্প্রচারের সময় হাতে রাইফেল ধরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় চ্যানেল ‘অফোগ’-এর এক পুরুষ উপস্থাপক হোসেইন হোসেইনি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সরাসরি সম্প্রচারে স্টুডিও’র ছাদের দিকে গুলি ছোড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে চ্যানেল-৩-এর নারী উপস্থাপক মোবিনা নাসিরি রাইফেল হাতে দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, “ভানাক স্কয়ার থেকে আমাকে একটি অস্ত্র পাঠানো হয়েছে, যাতে আমি আপনাদের মতোই এটি ব্যবহার শিখতে পারি।”