রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে এক বছরের ছেলে রিফাত হাসানকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসেছেন আকলিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘সাত দিন আগে ছেলের জ্বর হয়, পরে গায়ে র্যাশ ওঠে। বেসরকারি ক্লিনিকে ছেলেকে দেখালে চিকিৎসক জানান, এটা হামের লক্ষণ। তিনি এই হাসপাতালে আনতে পরামর্শ দেন। এরপর থেকে এখানেই হামের চিকিৎসা চলছে। এত রোগীর ভিড়ে শয্যা না পাওয়ায় বারান্দাতেই ছেলেকে নিয়ে আছি।’ ছেলেকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল কি না, জিজ্ঞাসা করলে আকলিমা বলেন, ‘হামের টিকা পায়নি রিফাত। শুধু হাম না অন্য টিকাগুলোর মধ্যেও বেশ কিছু টিকা পায়নি। টিকা দেওয়ার জন্য ইপিআই কেন্দ্রে কয়েক দিন ঘুরেছি। টিকা না থাকায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব টিকা বাইরে থেকে কেনা যায় কি না সেটা আমার জানা নেই। তাই ছেলেকে টিকাও দেওয়া হয়নি।’ দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর বড় কারণ হামের টিকা না পাওয়া। ইপিআই সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৪০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। ১১টি রোগ প্রতিরোধে শিশুর জন্মের পর থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত দিতে হয় আট ধরনের টিকা। যক্ষা, হাম, রুবেলা ও মুখে খাওয়ানোর পোলিও টিকা, হেমোফিলিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস সহ পাঁচটি রোগ প্রতিরোধের টিকা পেন্টাভ্যালেন্ট দেওয়া হয় শিশুদের। ১৯৭৯ সাল থেকে দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে টিকা দেওয়া চলছে। শিশুদের টিকার পেছনে বছরে খরচ এক হাজার কোটি টাকার বেশি। এত দিন অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে টিকা কিনে সরকার ইপিআইকে দিত। সারা দেশে শিশুদের টিকা দেওয়ার দায়িত্ব ইপিআইয়ের। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে হঠাৎ করে ওপি বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে শিশুদের টিকা পাওয়ার হার কমে আসে।
২০২৫ সালে মাত্র ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় এসেছে। অথচ ২০২৪ সালে ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ আওতায় এসেছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যেও টিকা দেওয়ার হার ছিল ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেশির ভাগ অবকাঠামো, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ৩৬টি অপারেশন প্ল্যান (ওপি)-এর মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া এসব কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে ভাটা পড়ে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, এইডস নিয়ন্ত্রণ, টিকা কর্মসূচিসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে। শুধু তাই নয়, ফিরে আসার ঝুঁকি বেড়েছে কালাজ্বর, ফাইলেরিয়ার মতো যেসব রোগ দেশ থেকে নির্মূল হয়ে যাওয়ার পথে ছিল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচিতে ওপির অনেক সাফল্য রয়েছে। ওপি বন্ধ করে দেওয়া একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। ওপি বন্ধ করে দেওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে টিকা কর্মসূচিতে। এখন হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নজরে এসেছে। তবে ৯ মাস বয়সে টিকা নেওয়ার আগেও শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এটা দুশ্চিন্তার বিষয়। ইউএসআইডির ফান্ড বন্ধ হওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।’
তিনি আর বলেন, ‘জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছিল। চতুর্থ কর্মবার্ষিক পরিকল্পনায় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে মানুষ ও কুকুরের টিকার পেছনেই ব্যয় করা হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব বিনিয়োগ বিফলে গেছে। ভবিষ্যতে এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কঠিন হয়ে পড়বে।’ জানা যায়, ১৯৯৮ সালে প্রথম সেক্টর প্রোগ্রাম শুরু হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে চতুর্থ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির শেষ হয়েছে। এরপর আর শুরু হয়নি। হঠাৎ করে ওপির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে স্বাস্থ্য খাত। ওপি বন্ধ করে ইউনিসেফ থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এজন্য বাজেট, চিঠি চালাচালির দীর্ঘসূত্রতাতেই চলে যায় অনেক সময়। টিকা কেনার প্রক্রিয়াতে দেরি হওয়ায় দেশে শুরু হয় টিকার জন্য হাহাকার। টিকার সংকটে শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের সেই শঙ্কা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। টিকা না দেওয়ার কারণে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে হাম। হামের প্রকোপ হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর ভিড়। এ পর্যন্ত ৪১ শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে হাম। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে যে সুপারিশগুলো করেছিল যেগুলো বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অপারেশন প্ল্যানগুলো (ওপি) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতের গুণগত পরিবর্তনে কিছুই করেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলে নিতে একগুচ্ছ উদ্যোগের বিষয়ে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই দৃশ্যমান হয়নি। ওষুধ সহজে পাওয়ার লক্ষ্যে সারা দেশে ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে সারা দেশে সরকারি ৭০০ হাসপাতালে এই ফার্মেসি করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো কার্যকর না হওয়ায় কমেনি সাধারণ মানুষের ওষুধের খরচ। বছরজুড়ে চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন স্তরের স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, ইন্টার্ন চিকিৎসক, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে মুখর ছিল স্বাস্থ্য খাত। এর সঙ্গে ছিল বদলির হিড়িক। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের ৩২ সুপারিশের মধ্যে কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।