অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান কোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। বড় প্রকল্পের মধ্যে দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিলেও শেষ পর্যায়ে তা-ও ভেস্তে যায়। দায়িত্ব গ্রহণের পর এ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া শোধ ও ব্যয় সাশ্রয়ের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে এখাতে বড় বড় দুর্নীতির কথা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা বললেও এজন্য দায়ী কোনো ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। সরকার ধারাবাহিকভাবে আগে যা হয়েছে তার সুরক্ষা দিয়েছে এবং তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে মাত্র।


আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া পুরোনো কূপের সঙ্গে নতুন কিছু কূপ খনন কার্যক্রম, কিছু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি সই ছাড়া দৃশ্যমান কার্যক্রম নিতে দেখা যায়নি অন্তর্বর্তী সরকারকে। এ সরকারের আমলে নতুন করে কোনো গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। তবে আওয়ামী লীগ আমলে নেওয়া কিছু প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। সম্প্রতি নিজের বিদায়ি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আমরা ২০১০ সালের যে কালো আইন ছিল সেটি বাতিল করেছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে বিইআরসির ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে দিয়েছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করেছি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি হয়েছে কিন্তু এ দুর্নীতি কীভাবে হলো আমরা তা অনুসন্ধান করেছি। এজন্য দুটি কমিটি করা হয়েছিল। যে কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে বলেছে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে। প্রতিটি সরকারি অফিস রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিং পলিসির আওতায় নিয়ে এসেছি। সৌরবিদ্যুতের চুক্তির জন্য উন্মুক্ত চুক্তির ব্যবস্থা করেছি। আমাদের বিশাল অঙ্কের বকেয়া পরিশোধ করতে হয়েছে।’


জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সামাল দিতে এবং এ খাতে যাতে সংকট না ঘটে সে চেষ্টাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার অতীতের ভুল, বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল। এজন্য তারা ভবিষ্যতের ইস্যুগুলোতে মনোযোগ দিতে পারেনি। নবায়নযোগ্য খাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু নীতিমালা করে এ বিষয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পুরোনো প্রকল্প বাতিল করে নতুন করে টেন্ডারের মাধ্যমে যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে সেখানে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে।’


জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ শুধু তাদের রুটিন মেনে কাজ করেছে। জ্বালানি ও অনুসন্ধান খাতে বিনিয়োগ এবং এর কার্যক্রম বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়নি। বরং সাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রমে ধীরগতি চলে এসেছে। অনেকটা ঠেকা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের কাজ করছে। উদ্যোগ নিয়ে নতুন কিছু করার মতো কিছু দৃশ্যমান হয়নি।’


কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা দরকার এবং তা আমদানি করতে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দরকার তা জোগাড়ের সামর্থ্য সরকারের নেই। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ ব্যর্থতা আরও প্রকট ও দৃশ্যমান হয়েছে। এই যে অবস্থা বিরাজ করছে তা প্রতিকারের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা ও সংস্কারের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার করে যায়নি।’