বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী কারা? এ রকম প্রশ্নের উত্তরে সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ আসলে চলছে সিন্ডিকেটের রাজত্বে। কোথায় নেই সিন্ডিকেট? সকালে বাসা থেকে বের হবেন, দাঁড়াবেন বাসার কাছে সিএনজিচালিত অটোরিকশাস্ট্যান্ডের সামনে। কেউ যাবে না। কেউ তাকিয়ে থাকবে আকাশের দিকে, কেউবা অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকবে। আপনি যে একজন মানুষ, এটাই মনে করবে না। আপনি নিজেকে অপমানিতই শুধু মনে করবেন না, মনে হবে অতি তুচ্ছ গুরুত্বহীন এক প্রাণী। অনেকক্ষণ অনুনয়বিনয় করার পর হয়তো একজন চালকের দয়া হবে। আপনাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত মাপবে। নিজেকে মনে হবে কোরবানির হাটের গরু। তারপর সিগারেটে সুখটান দিয়ে বলবে, যামু। আপনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাহনে ওঠার জন্য এগিয়ে যাবেন, এমন সময় চালক এমন এক ভাড়া চেয়ে বসবে যাতে আপনি বুকে ব্যথা অনুভব করবেন।
না, এটি কোনো কল্পিত ঘটনা নয়। গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়, এমন সব মানুষের কমবেশি এ রকম অভিজ্ঞতা আছে। শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশা কেন? দেশজুড়ে সব গণপরিবহনের একই হাল। গণপরিবহনের কাছে রীতিমতো জিম্মি মানুষ। ১৫ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে রাবেয়া খাতুনের অসহায়ত্বের কথাই ধরা যাক। বকশীবাজারের বাসিন্দা রাবেয়া একজন শিক্ষিকা। খুব ভোরে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁকে দ্রুত নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে কোনো চিকিৎসক না থাকায় তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে স্বামীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে স্বামীকে নিতে চান। সামনেই সারি সারি অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছে। কিন্তু কেউ যাবে না! এত ছোট ট্রিপ দিয়ে তাদের পোষাবে না বলে জানিয়ে দেয়। নিতে হলে পুরো দিনের ভাড়া লাগবে। অগ্যতা রাবেয়া খাতুন ঢাকা মেডিকেল থেকে পান্থপথ যাওয়ার জন্য ৩ হাজার টাকা ভাড়া দেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা তো জিম্মি। আমাদের দেখার কেউ নেই!’
সত্যি সাধারণ মানুষ সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়। গণপরিবহনের সর্বত্র চলছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য মিটার আছে। কিন্তু মিটারের কথা ভুলেই গেছেন যাত্রীরা। একজন যাত্রী বললেন, ‘মিটারের কথা বলতেও ভয় লাগে!’ সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিচালিত হয় একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। আগে এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। ৫ আগস্টের পর সিন্ডিকেটের হাত বদলেছে। কিন্তু নিয়ম একই আছে। একটি টোকেনের মাধ্যমে এ সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়। ঢাকার রাস্তায় কোনো সিএনজি চলতে হলে এ টোকেন লাগবেই। এ টোকেন ছাড়া কোনো চালক গাড়ি চালাতে পারবেন না। প্রতি টোকেনের মাসিক ভাড়া ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। চালক দিনের শেষে যে টাকা মালিককে দেন, সেখান থেকেই এ টাকা সিন্ডিকেটের গডফাদারকে দেওয়া হয়। এর বাইরে আছে পুলিশের চাঁদা, স্ট্যান্ডের চাঁদা।
সিএনজির মতোই সিন্ডিকেট আছে রোগী পরিবহনের অ্যাম্বুলেন্সে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে নির্ধারিত সাতটি অ্যাম্বুলেন্সস্ট্যান্ডে দাঁড়ানোর জন্যই মাসে ভাড়া দিতে হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সরকারি রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করলে কেন ভাড়া দিতে হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে একজন চালক জানান, ভাড়া না দিলে গাড়িই থাকবে না! ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের স্ট্যান্ডটির আগের সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন যুবলীগের একজন নেতা। ৫ আগস্টের পর প্রথমে এ সিন্ডিকেট দখল করেছিলেন বিএনপির একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা। কিন্তু তিনি বেশি দিন এর কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পারেননি। এখন এ সিন্ডিকেটের প্রধান হলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একজন নেতা।
গণপরিবহনের আগের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক ছিলেন একজন সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। ৫ আগস্টের পর এ সিন্ডিকেটের চাবি চলে এসেছে বিএনপির এক নেতার হাতে। ফলে একই নৈরাজ্য চলছে গণপরিবহনে। তাঁরা ইচ্ছামতো বাসভাড়া নির্ধারণ করেন, রুট নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ধর্মঘটের নামে জনগণকে জিম্মি করেন। মালিক-শ্রমিকদের একাংশ যাত্রীদের ওপর দৌরাত্ম্য চালিয়ে যায়, আর সরকারও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব যদি সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করে। কিন্তু নানান সময়ে দেখা যায়, এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক মহলের কিছু লোকও জড়িত, ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এর বাইরে আছে গণপরিবহনে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটই মূলত গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা। গণপরিবহন খাতে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয়। এ চাঁদাবাজি প্রধানত তিন পদ্ধতিতে হয়। প্রথমত মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকা চাঁদা, দ্বিতীয়ত বাস-মিনিবাস নির্দিষ্ট পথে নামাতে মালিক সমিতি সংগঠনের চাঁদা (বাসপ্রতি ২-২৫ লাখ টাকা) এবং তৃতীয়ত রাজধানী ও আশপাশে কোম্পানির অধীনে বাস চালাতে ওয়েবিল বা গেটপাস চাঁদা (প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকা। টিআইবির হিসাবে দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা।
গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদরা সম্পৃক্ত। এর ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। এদিকে যাত্রীদের ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন। এভাবেই সিন্ডিকেট গ্রাস করেছে পরিবহন খাত। এতে জিম্মি সাধারণ মানুষ।