নির্মাণে অনুমোদন ছিল না। একাধিকবার নোটিশ দিয়েছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। একপর্যায়ে স্থাপনা অপসারণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তা সনদও ছিল না। এতসব অনিয়ম ও সতর্কবার্তার পরও পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা চালু ছিল কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে। শেষ পর্যন্ত সেই রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেছে ১০ পর্যটকের। এখন বড় প্রশ্ন, সরকারি সংস্থাগুলোর আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞার পরও কীভাবে চালু ছিল অননুমোদিত এই স্থাপনা?


শনিবার সকালে তিনতলা কাঠের রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্থাপনায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর বেলা ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত হন আরও কয়েকজন।


ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, রিসোর্টের অনুমোদন ও নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দিক তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে কারও দায় পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


তবে তদন্তের আগেই রিসোর্টটির অনুমোদনসংক্রান্ত নানা অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি জানান, টুপটুপ রিসোর্টকে ২০২৩ সালে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়। একপর্যায়ে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।


শুধু নির্মাণের অনুমোদন নয়, পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার পাশা জানান, ইনানীর ইকোলজিক্যাল এলাকায় কোনো রিসোর্টেরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই।


অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ছিল ঘাটতি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগেই রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গত জুনে পরিদর্শনের পর নোটিশও দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা সনদ। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, ফায়ার অ্যালার্মসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থারও ঘাটতি ছিল।


একই স্থাপনা নিয়ে একাধিক সরকারি সংস্থার আপত্তি ও সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সেখানে পর্যটকদের রাতযাপন চলছিল, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। তদন্ত কমিটির কাছে তাই শুধু আগুনের সূত্রপাতের কারণ অনুসন্ধানই নয়, বরং নোটিশ, অনুমোদন প্রত্যাখ্যান, পরিবেশগত ছাড়পত্রের অনুপস্থিতি এবং অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির পরও রিসোর্টটি চালু থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এই ১০ মৃত্যু কেবল একটি রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি কক্সবাজারের পর্যটন স্থাপনাগুলোর অনুমোদন, নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তদন্তে অনিয়ম ও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পর্যটন এলাকার অন্যান্য রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


কী ছিল সেই চার নোটিশে

বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা কউকের চারটি নোটিশে টুপটুপ রিসোর্টের নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিক আপত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।


প্রথম নোটিশটি দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর। এতে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ১০(২) ধারা অনুযায়ী অনুমোদিত নকশা ও প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়।


এরপর ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ দ্বিতীয় নোটিশ দেওয়া হয়। আগের নোটিশের পরও অনুমোদিত নকশা ও অনুমতিপত্র দাখিল না করায় ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩(বি) ধারা অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এতে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল।


নির্দেশ অমান্য করে নির্মাণকাজ চলতে থাকায় ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ তৃতীয় নোটিশ দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, আগের দুই নোটিশের কোনো জবাব না দিয়ে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় অননুমোদিতভাবে নির্মিত ভবনটি সাত দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় আইন অনুযায়ী ভবন ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি এর ব্যয় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায়ের কথা জানানো হয়।


সবশেষে ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ দেওয়া চতুর্থ নোটিশে ইনানী এলাকার সংশ্লিষ্ট জমিতে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানানো হয়। কক্সবাজারের মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে আবেদনটি প্রত্যাখ্যানের বিষয়টিও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।


অর্থাৎ, অগ্নিকাণ্ডের অনেক আগেই ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর ও ২১ ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ২৩ ও ৩১ জানুয়ারি—চার দফা নোটিশে রিসোর্টটির নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহার নিয়ে কউকের আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নথিভুক্ত হয়েছিল। এরপরও কীভাবে সেখানে পর্যটকদের থাকার কার্যক্রম চলেছে, তার জবাব এখন তদন্তে খুঁজতে হবে।