অন্ধজনে আলো দিতে প্রায় অর্ধশত বছর আগে সিলেট মহানগরীর মেজরটিলায় গড়ে ওঠে ‘জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতাল’। ‘জালালাবাদ অন্ধ কল্যাণ সমিতি’র উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি সিলেটের সবচেয়ে পুরোনো চক্ষু হাসপাতাল। দীর্ঘ পথচলায় স্বেচ্ছাসেবী এই প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা দিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অসংখ্য মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালটি এখন নিজেই সংকটের মুখে পড়েছে।
অব্যবস্থাপনা, পরিচালনা কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব, আয়ের উৎস সংকুচিত হওয়া এবং পাঁচ বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় হাসপাতালটির সংকট দিন দিন বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সেবাগ্রহীতাদের ওপর। কমে যাচ্ছে চিকিৎসাসেবার পরিধি এবং বহির্বিভাগ ও অস্ত্রোপচারের রোগীর সংখ্যা।
সিলেটে চক্ষুরোগীদের স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতাল। সরকারি-বেসরকারি অনুদান ও নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি চক্ষুসেবা দিয়ে আসছে। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি এখানে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও ছিল। চক্ষু চিকিৎসায় হাসপাতালটির যথেষ্ট সুনামও ছিল। সরকারি কর্মকর্তা ও সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়ে আসছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে হাসপাতালের ২৫ সদস্যের পরিচালনা কমিটিতে পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক সভাপতি এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন জীবন সদস্য ও বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ আগের কমিটি ভেঙে একটি এডহক কমিটি গঠন করেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তানির্ভর নতুন কমিটিতে আগের কমিটির অনেক জীবন সদস্যকে বাদ দেওয়া হয়।
এ সময় হাসপাতালের নিজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস বেশ কিছু দোকানপাট ভেঙে ফেলা হয়। এ ঘটনায় আগের কমিটির নেতারা আদালতের শরণাপন্ন হন। দোকানপাট থেকে আয় কমে যাওয়ায় হাসপাতালটির আর্থিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়।
অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসক ও নার্সের অভাবে ২০২০-২০২১ সালের পর থেকে হাসপাতালটির লাইসেন্স নবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে বর্তমানে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে। কমিটি নিয়ে বিরোধ, আয় কমে যাওয়া এবং প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় বহির্বিভাগ ও অস্ত্রোপচারে রোগীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন জানান, যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল না থাকায় ২০২০-২০২১ সেশনের পর হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ২০২১-২০২২ সালের জন্য লাইসেন্স নবায়ন ফি জমা দেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে লাইসেন্স হালনাগাদ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আগের পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সাবেক জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ নিয়মবহির্ভূতভাবে এডহক কমিটি গঠন করেছিলেন। হাসপাতালের আয়ের উৎস হিসেবে থাকা অনেক দোকানপাট ভেঙে ফেলায় প্রতিষ্ঠানটির আয় কমে গেছে। তাঁর দাবি, বর্তমান কমিটিতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা থাকলেও হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। ফলে লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে হাসপাতালটির কার্যক্রম চলছে এবং সেবার মান কমে যাওয়ায় রোগীর সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে।
তবে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ও সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি জানান, আগের পরিচালনা পর্ষদ নিয়মবহির্ভূতভাবে হাসপাতাল পরিচালনা করেছে। নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং লাইসেন্স নবায়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে শিগগিরই হাসপাতালটিকে নিয়মের মধ্যে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করে কয়েক মাসের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের চক্ষুরোগীদের স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, লাইসেন্স নবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং পরিচালনা কমিটির বিরোধ নিষ্পত্তি জরুরি। অন্যথায় হাসপাতালটির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য সাধারণ মানুষ মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চক্ষুসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।