রাজধানীতে যারা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তাদের তালিকা প্রস্তুত করেছে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ। ওই তালিকায় ৫৪৫ জনের নাম রয়েছে।


তালিকাভুক্ত এই চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে। ওই নির্দেশনার পর গত এক সপ্তাহে (গত সোমবার পর্যন্ত) আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অভিযান চালিয়ে তালিকাভুক্ত ৪৭ জন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। 


ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) সূত্র জানায়, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন শাখাকে সরবরাহ করা হয়েছে। ওই তালিকায় থাকা শাহিনুর আলম মারফতকে (৬০) গত ৪ অক্টোবর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। তিনি খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি। তবে পরদিনই তিনি জামিনে মুক্তি পান।


সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল থেকে গ্রেফতার করা হয় লিটন চোকদারকে (৩৯)। তেজগাঁও থানার একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ডিএমপির করা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকায় লিটনের নাম রয়েছে। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তালিকা পেয়েছি। নির্দেশিত হয়েছি।


সেই তালিকা অনুযায়ী এক সপ্তাহ ধরে গ্রেফতার অভিযান চলছে। গত সোমবার পর্যন্ত ডিএমপি থেকে মোট ৪৭ জন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে পুরনো মামলা রয়েছে, তাদের ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। আবার অভিযানে যাদের কাছে অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাদের অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। আর যাদের নামে কোনো মামলা নেই, তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী ডিটেনশনের চিন্তা করা হচ্ছে। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে।’



তবে কেউ কেউ বিশেষ ক্ষমতা আইনকে কালো আইন বলছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘বর্তমান সরকার চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। সেটা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। অতীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কাজ না করে বেআইনি কাজ, বেআইনি আটক, নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি করার মতো অভিযোগ আমরা শুনতাম। বাংলাদেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে আগের মতো কোনো অভিযোগ আমরা আর শুনতে প্রস্তুত নই। সুতরাং যে আইনই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে।’


ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীতে যে ৫৪৫ জন চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীর তালিকা করা হয়েছে তার মধ্যে ১৫৬ জন তেজগাঁও বিভাগের। এদের অনেকে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে এদের রয়েছে কিশোর গ্যাং।


ডিএমপির ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করেছে। ওই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা তালিকা পেয়েছি। তালিকাভুক্তদের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কে? ভুক্তভোগী নাকি পুলিশ? তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাবান। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে ভুক্তভোগীরা ঝামেলায় পড়তে পারেন। ফলে ভুক্তভোগী পাওয়া মুশকিল। আবার মামলার এজাহারে চাঁদাবাজদের সম্পর্কে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ না থাকলে আইনের ফাঁকফোকরে তারা জামিনে বেরিয়ে যায়।’


তবে ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মিলে যে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা করেছে, সেই তালিকায় থাকাদের অপরাধের বিপরীতে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের কি কি অপরাধ, তা যাচাই করার ব্যাপার আছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’


ডিএমপির তেজগাঁও থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মনে করুন আমি আজ একজন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি যদি জামিন পেয়ে যান, তাহলে আর আইন মানতে চাইবেন? সবকিছু ভেবে আমাদের ঊর্ধ্বতনরা যেভাবে নির্দেশনা দেবেন, সেভাবে আমরা কাজ এগিয়ে নেব।’


খিলক্ষেত থানার ওসি সোরহাব আল হোসাইন বলেন, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগে শাহিনুর আলম মারফতকে আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আমাদের কাছে দিয়ে দেয়। তারা কোনো মামলাও করেনি। পরে ডিবি তাকে নিয়ে যায়।’ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজের তালিকায় নাম থাকা প্রসঙ্গে শাহিনুর আলম মারফত মঙ্গলবার রাতে বলেন, ‘আমার মনে হয়, কেউ চক্রান্ত করে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়েছে। আমি রাজনৈতিকভাবে গ্রুপিংয়ের শিকার।’


ডিএমপি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের আটকের পর কোন প্রক্রিয়ায় আগানো হবে, সম্প্রতি এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসামিদের আপাতত পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছেন। তবে এ নিয়ে কিভাবে এগোতে চায় সরকার, সে বিষয়ে কাজ হচ্ছে। দ্রুতই সে মোতাবেক নির্দেশনা দেওয়া হবে।


ডিবির ওয়ারী বিভাগের ডিসি মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘ওয়ারী বিভাগে ২০ থেকে ২৫ জনের নাম রয়েছে তালিকায়। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছি। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। তারা চিহ্নিত রাঘববোয়াল। এটার একটি বড় পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে। মানুষও তাদের থেকে সতর্ক হবে।’ এসআরবির মুখপাত্র ও বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তালিকা পাওয়ার পর থেকে আমরা চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আভিযান শুরু করেছি। এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে এসআরবি। রাজধানীসহ সারা দেশেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।’