ফোনটি হাত থেকে সরিয়ে নিতেই কেঁদে উঠল ছয় বছরের আনাস। কান্না থামাতে আবার তাঁর হাতে ফোনটি ফিরিয়ে দেওয়া হলো। একটু পর একটি বল নিয়ে তাকে বাইরে খেলতে ডাকতেই অবশ্য দৃশ্য বদলে গেল। ফোন রেখে খেলতে চলে গেল সে।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের সরারচর গ্রামের শিশু আনাসের সঙ্গে কথা হচ্ছিল তার ফোন ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে। দুই ভাইয়ের মধ্যে আনাস ও আয়াসকে সামলাতে হয় মা সোনিয়াকে। তাদের বাবা সেতু থাকেন ঢাকায়। মা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকলে দুই ভাই ফোনে কার্টুন দেখে সময় কাটায়। বিশেষ করে মটু-পাতলুর মতো কার্টুন তাদের পছন্দ।
আনাসের কাছ থেকে ফোন নেওয়ার পর তার কান্না দেখে মনে হয়েছিল, ফোন ছাড়া হয়তো তাকে সামলানো কঠিন। কিন্তু খেলার প্রস্তাব পেয়ে ফোন ছেড়ে বাইরে যাওয়া অন্য একটি প্রশ্ন সামনে আনে। শিশুরা কি সত্যিই ফোন ছাড়া থাকতে পারে না, নাকি তাদের মনোযোগ অন্যদিকে নেওয়ার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ?
ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ১০ বছর বয়সী তুবার অভিজ্ঞতা আবার কিছুটা আলাদা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া তুবাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তার কাছ থেকে ফোন নিয়ে নিলে কেমন লাগবে। পাল্টা প্রশ্ন করে সে জানতে চাইল, ফোন কেন নেওয়া হবে।
তুবা জানাল, সে ফোনে কার্টুন, মাছের কার্টুন এবং মায়ের সাথে ভিডিও দেখে। পরে ফোনে কী দেখে, তা দেখাতে গিয়ে দেখা গেল, এবিসিডি, প্রাণী পরিচিতিসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্টুনও দেখে সে। এমনকি বাবা কাজ থেকে ফিরলে বাবার সাথে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিষয়ক ভিডিও দেখেও সময় কাটায় তুবা। ফোন সরিয়ে নেওয়ার পর খুব একটা বিরক্ত হয়নি তুবা। বরং ফোন রেখে আমার সঙ্গে খেলতে শুরু করে।
আবার ১৫ বছর বয়সী রাতুলের কাছে ফোনের অর্থ অন্য রকম। ফ্রি ফায়ার খেলার পাশাপাশি সে ভিডিও, পডকাস্ট, প্রযুক্তিবিষয়ক ভিডিও, খেলার হাইলাইটস দেখে। অনলাইন ক্লাসও করে।
ফোন ছাড়া এক দিন কাটানোর কথা কল্পনা করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে রাতুল বলে, ‘আমার তো পাগল পাগল লাগবে। মোবাইল ছাড়া আমি এক দিনও চলতে পারব না। মোবাইল ছাড়া আমি কীভাবে ফ্রি ফায়ার খেলব, কীভাবে সময় কাটাব, কীভাবে চ্যাট করব, কীভাবে বন্ধুদের ডাকব?’
রাতুলের কাছে ফোন তাই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগেরও একটি উপায়। তার ভাষায়, মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ না থাকলে তারা ফোনে ই-ফুটবল বা ফ্রি ফায়ার খেলে। গেমের মধ্যে চ্যাট করার সুযোগ থাকে। কখনো বাইরে দেখা হলেও একসঙ্গে বসে অনলাইনে খেলে।
তিন শিশুর তিন রকম অভিজ্ঞতা। কেউ ফোন সরালে কেঁদে ওঠে, কেউ সহজেই অন্য কাজে মন দেয়, আবার কারও কাছে ফোন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগেরও মাধ্যম। তাহলে স্ক্রিনটাইমের সমস্যা কি শুধু কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশুর চারপাশের পরিবেশ, পরিবারের সময় এবং বিকল্প কার্যক্রমের সুযোগ?
মোবাইল হাতে, বাবা ও মা এর মনে দুশ্চিন্তা
মানিকদীতে রিকশা চালান আব্দুল মান্নান। তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে সাজ্জাদ ভালো ক্রিকেট খেলে। পাড়ার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলে কিছু আয়ও করে। সেই টাকা থেকে সংসারে কিছুটা অবদান রাখে সাজ্জাদ।
সামনে এসএসসি পরীক্ষা। ছেলেকে নিয়ে বাবার স্বপ্ন ছিল, ভালো ফল করবে, সুযোগ পেলে একদিন ক্রিকেটার হবে। কিন্তু গত মাসে ছেলের জন্য মোবাইল কেনার পর থেকে দুশ্চিন্তা বেড়েছে তাঁর।
ফ্রি ফায়ার, পাবজির মতো গেম খেলার জন্য ছেলেকে ফোন কিনে দিয়েছিলেন আব্দুল মান্নান। তাঁর ভাষ্য, ফোন হাতে পাওয়ার পর সাজ্জাদ এখন অনলাইনে গেম নিয়ে পড়ে থাকে। পড়াশোনা, ঘুম, এমনকি শখের ক্রিকেট থেকেও তার মন সরে যাচ্ছে। পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আচরণেও আগ্রাসী ভাব দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আসলে আমি চাই সাজ্জাদ আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুক। ওর মোবাইল ব্যবহারে আমার দুশ্চিন্তা হয়।’
মোবাইল কেনার আগে যে বাবা হয়তো ভেবেছিলেন, ছেলের পছন্দের গেম খেলার সুযোগ করে দেবেন, এখন সেই সিদ্ধান্তই তাঁর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোন ব্যবহারের সীমা কীভাবে ঠিক করবেন, ছেলের পড়াশোনা ও খেলাধুলার আগ্রহ কীভাবে ফিরিয়ে আনবেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেলিনা আখতারও সন্তানের ফোন ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর ছেলের বয়স ১৩ বছর। নিজের ব্যস্ততার কারণে কিংবা ছেলের জেদের কাছে, তাকে একটি প্রিমিয়াম অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছিলেন তিনি।
কয়েক দিন ধরে তাঁর মনে হচ্ছিল, ছেলে কিছু একটা লুকাতে চাইছে। একদিন ছেলের ফোনের ব্রাউজারে ঢুকে বিভিন্ন আপত্তিকর ওয়েবসাইট দেখার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। সন্তানের জন্য ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়েন তিনি।
এখানে উদ্বেগটা শুধু ফোনে কত সময় কাটছে, তা নয়। শিশু কী দেখছে, কোন বয়সে দেখছে এবং অভিভাবক তার অনলাইন ব্যবহারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
মিরপুরে রিকশা চালান আজহার। তাঁর মেয়ে আরাফার বয়স ছয় বছর। মেয়ের ফোন ব্যবহারের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে বিরক্তি ও অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।
আজহার বলেন, ‘মা টিকটক দেখে, মেয়ে এটা শিখছে। আমি রিকশা চালাই, সারাদিন ব্যস্ত থাকি। মা রান্না করা আর বিভিন্ন কাজ করার সময় উপায় না পাইয়া মাইয়ার হাতে ফোনটা দেয়। মাইয়া এখন পুরা নেশায় ডুইবা গেছে। ফোন ছাড়েই না, সারাদিন টিকটক দেখে।’
কাজ শেষে বাসায় ফিরে মেয়ের হাত থেকে ফোন সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন আজহার। তখন আরাফা কান্না করে। মেয়ের ফোন ব্যবহার কমাতে তাকে বই কিনে দেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। বেশি ফোন দেখলে চোখের ক্ষতি হতে পারে, এমন উদ্বেগও রয়েছে তাঁর।
এই পরিবারের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় স্পষ্ট। ফোনের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে শুধু শিশুর আগ্রহ কাজ করে না। বাবা বাইরে কাজ করেন, মা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। শিশুকে সামলানোর একটি উপায় হিসেবে ফোন হাতে দেওয়া হয়। পরে সেই অভ্যাসই হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তার কারণ।
জরিপে মনোযোগ, বিরক্তি ও জেদের কথা
এই প্রতিবেদনের জন্য অভিভাবক, শিশু ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি একটি অনলাইন জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিবেদকের সংগ্রহের হিসাবে ৪৬টি ফর্ম পূরণ করা হয়েছে। এর বাইরে গ্রামের তিন অভিভাবকের সঙ্গে আলাদা কথোপকথন হয়েছে। মৌখিক সাক্ষাৎকারের তথ্য জরিপের সংখ্যার সঙ্গে যোগ করা হয়নি।
জরিপে উত্তরদাতাদের মধ্যে ছিলেন বাবা, মা, অন্য অভিভাবক, আত্মীয় এবং শিক্ষক। ঢাকা শহর থেকে এসেছে ৩২টি উত্তর, জেলা শহর থেকে নয়টি, গ্রাম থেকে তিনটি এবং উপজেলা থেকে দুটি। ফলে এই জরিপকে বাংলাদেশের সব শিশুর প্রতিনিধিত্বকারী নমুনা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতার একটি প্রাথমিক চিত্র।
fgfegege
স্ক্রিনটাইমের হিসাব দেওয়ার পদ্ধতিতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ৪৬টি উত্তরের মধ্যে ২৯ জন বলেছেন, তাঁরা অনুমান করে শিশুর স্ক্রিনে কাটানো সময় জানিয়েছেন। ১২ জন ফোনের Screen Time বা Digital Wellbeing দেখে হিসাব দিয়েছেন। তিনজন শিশুর কাছ থেকে জেনে এবং দুজন অন্যভাবে সময়ের হিসাব করেছেন।
কর্মদিবসে বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য দেওয়া মিনিটের সংখ্যাগুলো গড় করলে সময় দাঁড়ায় প্রায় ১৫২ মিনিট, অর্থাৎ প্রায় ২ ঘণ্টা ৩২ মিনিট। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গড় প্রায় ১৭৭ মিনিট বা প্রায় ২ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট। তবে এগুলো উত্তরদাতাদের দেওয়া সময়ের গড়, শিশুদের ডিভাইসে সরাসরি মাপা সময় নয়। কয়েকটি উত্তরে অনেক বেশি সময় থাকায় গড়ও প্রভাবিত হয়েছে।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি কী কাজে স্ক্রিন ব্যবহার করে, সেই প্রশ্নে ১৯ জন ইউটিউব বা ভিডিও দেখা, ১৩ জন শর্ট ভিডিও দেখা এবং সাতজন গেম খেলার কথা বলেছেন। টেলিভিশন দেখা, অনলাইন ক্লাস বা পড়াশোনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কথাও এসেছে কয়েকটি উত্তরে।
শিশুর আচরণে গত তিন মাসে কী ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে, এমন প্রশ্নে একাধিক উত্তর দেওয়ার সুযোগ ছিল। ৪৬টি রেকর্ডের মধ্যে ২৬টি উত্তরে বিরক্তি বা অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সংখ্যক উত্তরে স্ক্রিন বন্ধ করতে বললে বেশি রাগ করার কথা এসেছে। ২৩টি উত্তরে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্ক্রিন না পেলে জেদ করার কথা এসেছে ২২টি উত্তরে।
bdbdbdbdbdএ ছাড়া ১৭টি উত্তরে মেজাজ দ্রুত খারাপ হওয়ার, ১৫টিতে এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত চলে যাওয়ার, ১১টিতে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় কমে যাওয়ার এবং ১০টিতে ঘুমের সময় বা ঘুমের রুটিন বদলে যাওয়ার কথা এসেছে। আটটি উত্তরে আগের তুলনায় খেলাধুলা কমার কথা বলা হয়েছে। আটটি উত্তরে আবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানানো হয়েছে।
এসব তথ্য অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণ, স্ক্রিন ব্যবহার আর আচরণগত পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই একটিকে অন্যটির সরাসরি কারণ বলা যায় না। তবু উত্তরগুলো পরিবারগুলোর উদ্বেগের ধরন বুঝতে সাহায্য করে।
খাওয়ানোর সময় ফোন, ঘুমের আগেও স্ক্রিন
খাওয়ানোর সময় শিশুকে শান্ত রাখতে ফোন দেওয়া নিয়ে জরিপে একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র এসেছে। ২১ জন বলেছেন, প্রায় প্রতিদিন তাঁরা খাওয়ানোর সময় শিশুকে মোবাইল বা অন্য স্ক্রিন দেন। আরও আটজন বলেছেন, তাঁরা প্রায়ই দেন। অর্থাৎ এই দুই উত্তরে মোট ২৯ জন নিয়মিত বা প্রায় নিয়মিত স্ক্রিন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
শিশু কান্না বা জেদ করলে তাকে শান্ত করতে স্ক্রিন ব্যবহার করেন কি না, এমন প্রশ্নে ১০ জন বলেছেন প্রায় প্রতিবার এবং নয়জন বলেছেন প্রায়ই। বিপরীতে ১৩ জন বলেছেন, তাঁরা কখনো এভাবে স্ক্রিন ব্যবহার করেন না।
ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টায় শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ১২ জন বলেছেন, তাঁদের শিশু প্রতিদিন এবং ১১ জন প্রায়ই এই সময়ে স্ক্রিন ব্যবহার করে। ১১টি উত্তরে মাঝে মাঝে, তিনটিতে খুব কম এবং নয়টিতে কখনো না বলা হয়েছে।
fegrrgbrbr
শিশুর সামনে অভিভাবকের নিজের স্ক্রিন ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল। ১৭ জন বলেছেন, শিশুর সঙ্গে বা সামনে থাকার সময় তাঁদের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহার মাঝারি। আটজন বেশি এবং দুজন খুব বেশি ব্যবহারের কথা বলেছেন। শিশু কথা বলার সময় বাবা-মা নিজের মোবাইল ব্যবহার করেন কি না, এমন প্রশ্নে ১৯ জন বলেছেন মাঝে মাঝে, আটজন প্রায়ই এবং দুজন খুব বেশি ব্যবহার করেন।
vassaaga
এই ফলগুলো একটি প্রশ্ন সামনে আনে। শিশুকে ফোনের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পরিবারের বড়দের অভ্যাসও কি ভূমিকা রাখছে? আবার বড়দের ব্যস্ততা, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব কিংবা শিশুকে কিছুক্ষণ শান্ত রাখার প্রয়োজন কি এই অভ্যাসের পেছনে কাজ করছে?
শহর ও গ্রামের অভিজ্ঞতা এক নয়
গণমাধ্যমকর্মী নাজমুলের মেয়ে গ্রামে থাকে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে ফোনে গেম খেললেও কেউ ডাকলে তা রেখে বাইরে খেলতে যায়। বাসায় ফিরে আবার ফোন ব্যবহার করে। তাঁর ধারণা, গ্রামে বাইরে যাওয়ার ও খেলাধুলার সুযোগ থাকায় তাঁর মেয়ের জীবনে ফোনের গুরুত্ব সব সময় একই রকম থাকে না।
তবে এটি তাঁর নিজের মেয়েকে নিয়ে অভিজ্ঞতা। সব গ্রামের শিশুর পরিস্থিতিও যে এমন, তা বলা যায় না।
টাঙ্গাইলের জেলা সদরে থাকেন নারী উদ্যোক্তা তনয়া জামান। তাঁর বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর, ছোট মেয়ের চার। মেয়েদের ফোন ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা কিছুটা আলাদা। তনয়া জানান, ফোন না দিলে তাঁর বড় মেয়ে সাধারণত রাগ করে না। এখন ফোন দেখা যাবে না বললে মেনে নেয়।
তনয়া বলেন, ‘ফোনের প্রতি আসক্ত তো এখন সব বাচ্চাই। কিন্তু আমি যদি বলি, এখন দেখা যাবে না, মেনে নেয়।’
মেয়েরা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকলে নিজেই তাদের অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেন তনয়া। তাঁর ভাষ্য, ‘যখন মনে হয় অনেকক্ষণ স্ক্রিনের সঙ্গে আছে, তখন নিজেই বলি, এবার খেলো বা নিচে যাও, কিংবা কোনো কাজে যুক্ত হও। সাধারণত নিজে থেকে ফোন দিই না। তবে কখনো খুব ব্যস্ত থাকলে, ওরা বিরক্ত করলে একটু দেখার জন্য ফোন দিয়ে দিই।’
শিশুরা কেন ফোন বা টেলিভিশনের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে তনয়ার নিজের একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তাঁর মতে, শিশুরা আসলে খেলতে চায়, মা-বাবার মনোযোগও চায়। কিন্তু মা-বাবা যখন তাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না, তখন তারা ফোন বা টেলিভিশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
তনয়া বলেন, ‘আমার যেটা মনে হয়, বাচ্চারা খেলতেই চায়। ওরা মা-বাবার অ্যাটেনশন চায়। আমরা যখন সেটা দিতে না পারি, তখন তারা ফোন বা টিভি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।’
ঢাকা ও জেলা শহরের শিশুদের অভিজ্ঞতার তুলনা করতে গিয়ে তনয়া মনে করেন, রাজধানীর ব্যস্ত ও একঘেয়ে জীবনযাপনে শিশুদের স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা বেশি হতে পারে। জেলা শহরে বাইরে যাওয়া, খোলা জায়গায় থাকা কিংবা মাঠে খেলাধুলার সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকলে শিশুরা স্ক্রিনের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ পায়।
তাঁর ভাষায়, মা-বাবা সপ্তাহের ছয় দিন ব্যস্ত থাকলেও এক দিন শিশুদের বাইরে নিয়ে গেলে তারা খুশি হয়। বরং সেই দিনের অপেক্ষায় থাকে। তবে এটি তনয়ার নিজের অভিজ্ঞতা ও ধারণা, শহর ও গ্রামের সব শিশুর ওপর করা কোনো তুলনামূলক গবেষণার ফল নয়।
তনয়া মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ভবিষ্যতে শিশুর শরীর ও মনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিজের মেয়েদের ফোন ব্যবহারের সময়ের দিকে খেয়াল রাখেন এবং বেশি সময় স্ক্রিনে থাকলে অন্য কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
আলাদা কথোপকথনে আরও তিন গ্রামীণ অভিভাবক জানান, তাঁদের আট, ১২ ও ১৪ বছর বয়সী সন্তানরা ফোন ব্যবহার করলেও নিয়মিত স্কুলে যায় এবং বাইরে খেলাধুলার সময়ও পায়। তাঁদের পর্যবেক্ষণে, সন্তানদের আচরণে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাঁরা ফোনের Screen Time বা Digital Wellbeing দেখে ব্যবহারের সময় হিসাব করেননি। তবে আশপাশে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সম্পর্কে জানার পর সন্তানদের ফোন ব্যবহার নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
এই তিনটি অভিজ্ঞতা আনুষ্ঠানিক ফর্মের উত্তর নয়, পৃথক মৌখিক সাক্ষাৎকার। এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব শিশুর অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। কোথাও স্ক্রিনের ব্যবহার নিয়ে বড় উদ্বেগ রয়েছে, কোথাও আবার বাইরে খেলাধুলা ও পরিবারের নজরদারির কারণে অভিভাবকেরা তুলনামূলক স্বস্তিতে আছেন।
জরিপেও খেলাধুলার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। ১৪টি উত্তরে বলা হয়েছে, শিশুটি দিনে ৩০ মিনিটের কম বাইরে খেলাধুলা বা শারীরিক কর্মকাণ্ড করে। আরও ১১টি উত্তরে বলা হয়েছে, প্রায় খেলাধুলাই করে না। বিপরীতে ছয়জন এক থেকে দুই ঘণ্টা এবং চারজন দুই ঘণ্টার বেশি খেলাধুলার কথা জানিয়েছেন।
ghggheghh
একটি উত্তরে খেলার মাঠের অভাব এবং মেয়েশিশুর নিরাপত্তার কারণে বাইরে যেতে না দেওয়ার কথাও এসেছে। ওই অভিভাবকের ভাষ্যে, শিশুটি বাসার ঘরেই খেলে। যে কিন্ডারগার্টেনে পড়ে, সেটিও একটি আবাসিক ভবনে; সেখানে খেলার মাঠ নেই।
এখানে স্ক্রিনের বাইরের আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। খেলাধুলার নিরাপদ জায়গা না থাকলে বা সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মেশার সুযোগ কম থাকলে শিশুর অবসর কীভাবে কাটবে, সেটিও ভাবতে হবে।
কনটেন্ট, ভাষা ও শিশুর বিকাশ
বিইউপির ডিপার্টমেন্ট অব অডিওলজি অ্যান্ড স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ফাতিমা মেঘলা মনে করেন, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, একমুখী ভিডিও বা কার্টুন দেখার সময় শিশুর অন্য মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এতে ভাষা শেখা, শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা এবং যোগাযোগের দক্ষতা গড়ে ওঠার সুযোগ কমতে পারে।
ফাতিমা মেঘলার মতে, শিশুরা সামনাসামনি যোগাযোগের মধ্য দিয়ে মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা ও অনুভূতির আদান-প্রদান শিখতে থাকে। কেবল স্ক্রিন দেখার মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতার বিকল্প তৈরি হয় না।
তিনি আরও বলেন, ছোট শিশুদের খাওয়ানোর সময় বা কান্না থামাতে নিয়মিত মোবাইল দেওয়ার অভ্যাস তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের সময় কমিয়ে দিতে পারে। ভাষা শেখার ক্ষেত্রে কথোপকথনের পালাবদল এবং অন্যের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার জাহিদ হোসাইন খান বলেন, শিশু কতক্ষণ স্ক্রিনে থাকছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে তার অভিজ্ঞতা বোঝা যাবে না। সে কী দেখছে এবং স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সময় কতটা কমছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, বয়সোপযোগী শিক্ষামূলক কনটেন্ট সীমিত মাত্রায় ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত বা একমুখী বিনোদনমূলক কনটেন্ট শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনের জায়গা দখল করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
জাহিদ হোসাইন খান বলেন, স্ক্রিন বন্ধ করার পর সাময়িক বিরক্তি আর সমস্যাজনক ব্যবহারের লক্ষণ এক নয়। শিশু বিকল্প কোনো কাজে সহজেই মনোযোগ ফেরাতে পারছে কি না, তার পড়াশোনা, ঘুম, খাবার ও সামাজিক মেলামেশা ব্যাহত হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
নয়া বাজার মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মোজাম্মেল হোসেনের পর্যবেক্ষণ, ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সী কিছু শিক্ষার্থীকে মোবাইলে অনুপযুক্ত ভিডিও দেখার কারণে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষামূলক কাজে মোবাইলের প্রয়োজন থাকলেও অনেক অভিভাবক প্যারেন্টিং কন্ট্রোল বা কিডস মোডের মতো সুবিধা সম্পর্কে জানেন না। ফলে সন্তান কী দেখছে, তা সব সময় নজরে রাখা সম্ভব হয় না।
স্টারলিং কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষিকা বৃষ্টি হোসেন বলেন, তাঁর ক্লাসের অনেক শিশু অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল ব্যবহার করে। তবে কিছু শিশু মোবাইলে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়লে পড়াশোনা ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারায় বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে ফোন ব্যবহারের কারণে শিশু বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের থেকেও দূরে সরে যেতে পারে।
কখন উদ্বেগের ঘণ্টা বাজে
শিশুর অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং মানসিক বা আচরণগত সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। সাময়িক বিরক্তি বা জেদ দেখালেই শিশুকে আসক্ত বলা যায় না। সমস্যা গুরুতর হচ্ছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রে দেখতে হবে স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে তার পড়াশোনা, ঘুম, খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক কতটা ব্যাহত হচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল (সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল) ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন নির্ভরতা শিশুদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ ও সাইকোসোমাটিক উপসর্গের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অপরিকল্পিত ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে অনুপযুক্ত কনটেন্টে প্রবেশ এবং পর্নোগ্রাফির প্রতি নির্ভরতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।(তাঁর বক্তব্যের সূত্র নিউ এজের ‘Device overdependency affects child health in Bangladesh’ শীর্ষক প্রতিবেদন।)
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু, কিশোর ও পরিবার সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ শিবলী সাদিক একই প্রতিবেদনে ঢাকার শিশুদের নিয়ে আইসিডিডিআর,বির গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা টানার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে দৈনিক এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনটাইম না রাখার বিষয়টি এসেছে। তবে এই পরামর্শকে সব বয়সী শিশুর জন্য একক বৈজ্ঞানিক সীমা হিসেবে দেখার আগে মূল গবেষণা ও নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ বিষয়ে সতর্কতা ও গবেষণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। জার্মান সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথের মুখপাত্র এবং রুর বিশ্ববিদ্যালয় বোখুমের অধ্যাপক ড. সিলভিয়া স্নাইডার বলেন, শিশু-কিশোরদের মিডিয়া ব্যবহার এবং উদ্বেগ-বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তবে সম্পর্ক দেখা গেলেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে স্ক্রিন ব্যবহারই মানসিক সমস্যার কারণ।
জার্মান সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথের প্রেস রিলিজে তাঁর সতর্কতার সারকথা, তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে শক্ত প্রমাণ পেতেও দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তাই ডিজিটাল মিডিয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা ও আরও গবেষণা প্রয়োজন।
একই প্রতিষ্ঠানের গবেষক ড. ইসাবেল ব্রান্ডহোর্স্ট মনে করেন, স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময়ের বিনিময়ে শিশুর বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; স্ক্রিন বন্ধ করার পর শিশুকে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ ও অন্য আনন্দদায়ক কার্যক্রমের সুযোগও দিতে হবে।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জোয়ান লুবির বক্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। ‘Early Childhood Mental Health and Media Use’ শীর্ষক Children and Screens প্রতিবেদনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, আবেগ চেনা, সহানুভূতি শেখা ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতা সরাসরি মানবিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। স্ক্রিন সেই অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না।
নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান ও ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল সেন্টারের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আন্দ্রেয়া বেথ টেমকিন-ইউ চাপ বা অস্বস্তির সময় নিজেকে শান্ত করতে শিশুর স্ক্রিনের ওপর নির্ভর করাকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখেছেন। নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ানের ‘Screen Addiction: How To Tell If Your Child’s Screen Use Is Harming Their Health’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এই বক্তব্যগুলো মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল সতর্কতা হলো, শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ের পাশাপাশি তার দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। শিশুকে শুধু বকাঝকা বা ফোন কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে সামলানোর চেষ্টা না করে নিয়মিত রুটিন, বিকল্প কার্যক্রম এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তার দিকে নজর দিতে হবে।
শিশুর অধিকার শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া নয়
শিশুর স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে আলোচনা অনেক সময় ফোন দেওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নে এসে থামে। কিন্তু শিশুর অধিকার বিবেচনায় বিষয়টি আরও বিস্তৃত।
শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, খেলাধুলা, বিশ্রাম, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজের মত প্রকাশের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট বা অনুপযুক্ত যোগাযোগ থেকে সুরক্ষিত থাকাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখা, তথ্য পাওয়া ও যোগাযোগের সুযোগও অস্বীকার করা যায় না।
আনাসের অভিজ্ঞতা দেখায়, ফোন নেওয়ার পর সে কেঁদেছিল, কিন্তু বল নিয়ে খেলতে ডাকলে বাইরে চলে গেছে। তুবাও ফোন রেখে খেলায় মন দিয়েছে। রাতুলের অভিজ্ঞতায় আবার ফোন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। তাই সব শিশুর জন্য একই ব্যাখ্যা বা একই ব্যবস্থা কার্যকর হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
শিশুকে শুধু ফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না, তার জন্য বিকল্প আনন্দ ও শেখার সুযোগও তৈরি করতে হবে। নিরাপদ খেলার মাঠ, বই, সৃজনশীল কাজ, পরিবারের সঙ্গে সময় এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেশার সুযোগ না থাকলে ফোনের বাইরে শিশুর অবসর কীভাবে পূরণ হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকের ভূমিকার পাশাপাশি স্কুল, পরিবার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও আলোচনায় থাকা দরকার। শিশুর অনলাইন গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে, তাকে অপমান বা ভয় দেখিয়ে নয়, বোঝাপড়া ও বয়সোপযোগী নিয়মের মাধ্যমে নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
জরিপে স্ক্রিন ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে ১৭টি উত্তরে বাইরে খেলাধুলা, ১০টিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নয়টিতে আঁকা বা গানের মতো সৃজনশীল কাজের কথা এসেছে। বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি খেলাধুলার কথা এসেছে পাঁচটি উত্তরে, বই পড়ার কথা তিনটিতে।
এগুলো অভিভাবকদের মতামত। কিন্তু এর ভেতরেই একটা প্রয়োজনের ইঙ্গিত রয়েছে। শিশুর জন্য ফোনের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ যত বেশি থাকবে, তত বেশি বিকল্প তৈরি হতে পারে।
স্ক্রিনের সময় নয়, শিশুর দিনটা কেমন কাটছে
শিশুর মোবাইল ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের জায়গা আছে, কিন্তু সেই উদ্বেগের সমাধান একমাত্র ফোন কেড়ে নেওয়া নয়। শিশুটি কী দেখছে, কতক্ষণ দেখছে, কখন দেখছে এবং স্ক্রিনের কারণে তার ঘুম, খেলাধুলা, পড়াশোনা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেগুলো একসঙ্গে দেখা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রতিটি শিশুর অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে। কেউ ফোন সরালে কাঁদে, কেউ সহজেই অন্য কাজে মন দেয়, কেউ আবার অনলাইন গেমের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। তাই নির্দিষ্ট আচরণ দেখেই শিশুকে ‘আসক্ত’ বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। সমস্যার স্থায়িত্ব, দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব এবং বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রতিবেদনের জরিপে অংশ নেওয়া অনেক অভিভাবক মনোযোগ, বিরক্তি, জেদ ও আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। আবার কিছু উত্তরদাতা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখেননি। তিন গ্রামীণ অভিভাবকের মৌখিক অভিজ্ঞতাতেও তুলনামূলক স্বাভাবিক রুটিনের কথা এসেছে। এই বৈচিত্র্য মনে করিয়ে দেয়, শুধু স্ক্রিনের সময় দিয়ে শিশুর বিকাশের পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
শিশুর হাতে ফোন আছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রশ্ন জরুরি। ফোনে সে কী দেখছে? কেন দেখছে? ফোন সরিয়ে দিলে তার প্রতিক্রিয়া কী? সে বাইরে খেলতে পারে কি? পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় পায় কি? অনলাইনে নিরাপদ আছে কি? এছাড়াও অভিভাবকদের জানতে হবে কিডস মোড, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল কীভাবে ব্যবহার করে, এসব আধুনিক বিষয় সম্পর্কে।
শিশুর শৈশবের বড় একটি অংশ যদি স্ক্রিনের সামনে কাটে, তাহলে শুধু ঘণ্টা গুনে তার উত্তর পাওয়া যাবে না। বরং জানতে হবে, সেই সময়ের মধ্যে শিশুটি কী শিখছে, কার সঙ্গে যুক্ত থাকছে এবং স্ক্রিনের বাইরে তার নিজের জগৎটা কতটা বড় হয়ে উঠছে?