অত্যন্ত সীমিত বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে চলছে দেশের বিদ্যুৎ খাত। এই মুহূর্তে দেশে বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়ার মতো ব্যবস্থা খুব বেশি নেই। এর অন্যতম কারণ জ্বালানিস্বল্পতা। জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যতই থাকুক না কেন তা কাজে আসবে না। এজন্য বর্তমান সংকট কাটাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কয়লাসংকটে যাতে বন্ধ না হয় তা সরকারকে নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একদিকে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা সংকটসহ কারিগরি সমস্যা, অন্যদিকে বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতির কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকার ১৭ বছরে কারিগরি সক্ষমতাসহ অন্যান্য যোগ্যতা না দেখে কেবল দলীয় ও আর্থিক সুবিধার জন্য একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা হলে তা কীভাবে সমাধান করা হবে সেসব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর ফলে এখন বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি বা জ্বালানিসংকটে বন্ধ হয়ে পড়লে এর চাপ পড়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই মুহূর্তে কোনো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগারি ত্রুটি বা জ্বালানিসংকটে বন্ধ হয়ে গেলে সেই সংকট সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নেই। কারণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখন টেনেটুনে চলছে। এই মুহূর্তে আমাদের কোনো রিজার্ভ নেই। রাতারাতি এ ধরনের সমস্যার সমাধান করা যায় না। আমাদের অতিরিক্ত সক্ষমতা আছে কিন্তু তা জ্বালানির অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। জ্বালানি থাকলে বিকল্প ছিল। তবে জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা আর না থাকা একই বিষয়। কমপক্ষে কয়লার অভাবে যাতে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ না হয় এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেরামত কাজ শুরুর আগে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারটি ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। আর এটি সচল হতে আরও কয়েক দিন লাগবে। এই অবস্থায় লোডশেডিং আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।


পাওয়ার সেলের তথ্যে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। ফলে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হলেই যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাবে এমন  হওয়ার কথা না। কিন্তু এটি স্বাভাবিক সময়ের কথা। স্বাভাবিক সময়ে কারিগরি ত্রুটির জন্য হঠাৎ একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে এবং কয়েক শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে এটি সামাল দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বর্তমানে গ্যাস, তেল ও কয়লার সংকটে এই জ্বালানিগুলো দিয়ে পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। অনেকগুলোর উৎপাদন বন্ধ আছে। বর্তমানে দেশের ৩৭টি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানিসংকট, কারিগরি ত্রুটি ও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বন্ধ আছে।


পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসির তথ্যে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে ওঠানামা করছে। আর ফার্নেস ওয়েল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড় উৎপাদন ২২শ মেগাওয়াট হলেও পিক আওয়ারে এটি বেড়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু গত কয়েক দিনের তথ্যে, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা যখন সর্বোচ্চ ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায় তখনো উৎপাদন ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে থাকছে। অর্থাৎ গড়ে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুতের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।


পিডিবি কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানিসংকট, বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ ও কারিগরি সমস্যা এবং তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি চাপ-সব মিলে বিদ্যুৎ খাতে বড় আরেকটি বিভ্রাট সামাল দেওয়া মতো সক্ষমতা খুব একটা নেই।


ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সরবরাহও কমে যায়। দেশে বর্তমানে দিনে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ২৩শ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে এই পরিমাণ থাকে ২৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য বলছে, ৫৯টি গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিটের মধ্যে অন্তত ২৬টিতে এখন গ্যাসস্বল্পতা আছে। বেশ কয়েকটি গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র  বন্ধ আছে। বেশ কিছু পূর্ণ সক্ষমতার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। 


এই অবস্থায়  কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় ধরনের বিকল্প হিসেবে সহায়তা করার কথা। দেশের ৮টি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু গতকাল বিকাল ৫টায় ৪ হাজার ৭০৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। আদানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভাব আংশিকভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাড়তি উৎপাদন দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া দুই মাস ধরে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য ১২৪৪ মেগাওয়াটের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও গত ১১ সেপ্টেম্বর হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কয়লা সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে ১২৪৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরএনপিএল এর পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে ৭১৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এ ছাড়া ১২৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে প্রায় ১০৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এসএস পাওয়ার ১২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিপরীতে গড়ে প্রায় ১০৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তার পূর্ণ ক্ষমতার কাছাকাছি পর্যায়ে কাজ করছে। ১১৫০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার বিপরীতে গড়ে ১১৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। আর ৩০৭ মেগাওয়াট বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে প্রায় ১৭১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যে এই কেন্দ্রটির ক্ষেত্রে ‘নিম্নমানের কয়লা’ ব্যবহারকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবস্থায় সরকার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর  নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে সরকারি ও বেসরকারি ৫৩টি কেন্দ্র থেকে ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন গড়ে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।


কিন্তু এখন পর্যন্ত গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সীমাবদ্ধ। তবে এই কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটেও নেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিকল্প সরবরাহে উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। কিন্তু গড় উৎপাদনের পরিমাণ সরকারের নির্ধারিত সেপ্টেম্বরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।