দিনক্ষণ নির্ধারণে একক এখতিয়ার নেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি)-সরকারের এই ভাষ্যের পর পিছুটান নিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তারিখ আগামীকাল আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পরেই চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছে ইসি। গতকাল নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত নয়। বৃহস্পতিবার আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এটি চূড়ান্ত হবে।


এদিকে গতকাল সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখের বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না বলে মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।’


এ এম এম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন ইসি এবার সাত ধাপে ইউপি ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার কমিশনে এ নিয়ে আলোচনার পর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ইউপি ভোট শুরু করতে পারব। ভোটের তারিখ নিয়ে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত নয়। আন্তমন্ত্রণালয় সভা আছে ১৭ সেপ্টেম্বর, সেখানে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।’


গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তুতিমূলক সভা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় থাকে। নির্বাচন কমিশন যে তারিখগুলো ঘোষণা করেছে, সে বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। সরকার এ ব্যাপারে কিছু জানে না। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরও গতকাল নির্বাচন কমিশন বৈঠক করেছে।


নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে একজন নির্বাচন কমিশনার সোমবার ব্রিফিং করেছেন। স্থানীয় নির্বাচন হবে এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে গত দুই দিন প্রাক্্-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, এর ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক সময়সূচি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি। ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জোগান নেওয়া হবে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।


 


নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সমর্থন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। দলীয় সমর্থনের আশায় মন্ত্রী-এমপি ও বড় বড় রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন তারা। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলগুলো আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়ে প্রার্থী ঘোষণা করছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্দলীয় এ নির্বাচনে দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতা ঠেকানোর সুযোগ নেই। নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকাশ্যে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনকে নিজেদের পক্ষে বড় সুবিধা হিসেবে দেখেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ফলে নির্বাচনের মাঠে এখন থেকেই শুরু হয়েছে নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করা এবং দলীয় প্রভাবশালী মহলের আস্থা অর্জনের চেষ্টা। নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কারণে ব্যালটে কোনো দলের প্রতীক থাকবে না। তবে মাঠের রাজনীতিতে দলীয় পরিচয়, স্থানীয় নেতাদের সমর্থন এবং কর্মী-সমর্থকদের সাংগঠনিক শক্তি ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে দলীয় মনোনয়ন না থাকলেও দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এ নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ চলছে। একই দলের একাধিক নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ায় কার পক্ষে দলীয় নেতারা অবস্থান নেবেন, তা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। কোথাও কোথাও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও দূরত্ব বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।  বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। কেউ সরাসরি সমর্থন চাইছেন, আবার কেউ দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাে  ও তাদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন। সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থী বলেন, নির্দলীয় নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। দলের নেতা-কর্মীরা পাশে থাকলে নির্বাচনি প্রচার, ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়। তাই দলীয় নেতাদের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচন নির্দলীয় হবে-এর মানে এই নয় যে সমাজটাকে রাজনীতিমুক্ত করে দেব। ভোটার হচ্ছে জনগণ। জনগণকে যদি আমরা রিপ্রেজেন্টেটিভ বলি তাহলে কিন্তু আমরা পলিটিক্যাল নেতাদেরই বলি, পলিটিক্যাল পার্টিকে-তারা ভোট করে। এখন যে দাঁড়াইতে পারবে দাঁড়াবে, উনি যদি বলেন যে আমার দল কর্তৃক মনোনীত করব, এখানে আমার কি বাধা দেওয়ার কিছু আছে? কোনো দোষ তো দেখি না। দলের ব্যানারে করা যাবে না-কেউ আর নৌকা মার্কা, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা এগুলো নিয়ে নির্বাচন করা যাবে না। কিন্তু নির্বাচন থেকে, সমাজ থেকে, জনগণ থেকে, ভোটার থেকে নির্বাচনি রাজনৈতিক দলকে আলাদা করার কি আমার সুযোগ আছে? দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতা ঠেকানোর ব্যাপারে কমিশনের কিছু করার আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসির কিছু করার নেই। আমরা মার্কাটা চেঞ্জ করে দিয়েছি যে মার্কা চলবে না। এর বাইরে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই।


এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আবদুল আলীম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ স্থানীয় নির্বাচনকে পুরোপুরি নির্দলীয় নির্বাচন বলি না। কারণ এ নির্বাচনে শুধু প্রার্থীরা দলের প্রতীক ব্যবহার করতে পারে না। এর বাইরে দলের কিছু লোক বাদ দিয়ে সবাই তার (সমর্থিত প্রার্থীর) জন্য কাজ করে। এর মধ্যে শুধু এমপিরা ক্যাম্পেইন করতে পারেন না, মন্ত্রীরা ক্যাম্পেইন করতে পারেন না। এ ছাড়া দলের সবাই কিন্তু তার প্রার্থীর জন্য কাজ করতে পারেন। আমাদের আইনি সিস্টেমটাই এরকম। বিষয়টি আইনে ক্লিয়ার থাকা দরকার ছিল। তিনি বলেন, আইনে দুটি পার্ট থাকা দরকার ছিল। একটি পলিটিক্যাল পার্টির জন্য। তারা কী করতে পারবে, কী করতে পারবে না, আরেকটা পার্ট প্রার্থীর জন্য, তার সমর্থকদের জন্য তারা কী করতে পারবে, কী করতে পারবে না-এরকম ডিভাইড করা থাকলে পরিষ্কার হতো। তিনি বলেন, আন অফিশিয়ালি নমিনেশন দল থেকে দেওয়া যাবে কি যাবে না কোথাও বলা নেই, কোনো আইনের মধ্যে নেই। দলীয় সমর্থনের কারণে স্বচ্ছ জনপ্রতিনিধি পাওয়া কঠিন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। বিগত ২০১৫ সালে যখন নন-পলিটিক্যাল ইলেকশনকে পলিটিক্যাল লেভেল দেওয়া হলো, তখন থেকে এই কালচার শুরু হয়ে গেছে। কাজেই এ কালচার এখনো বহাল আছে।