গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে হঠাৎ করেই বড় উল্লম্ফন ঘটেছে সরকারের করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন সময়ে এ খাতে আদায় হয়েছে ১৮৭৭৪ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় যা বেড়েছে প্রায় ৩ গুণ বা ১৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায়ও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে লভ্যাংশ থেকে। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এলেও এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নীতিবিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে করবহির্ভূত রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৬৩৫৮ কোটি টাকা। তিন মাস পর এপ্রিল-জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৭৭৪ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিল-জুনে আদায় হয়েছিল ৬৩৮২ বিলিয়ন টাকা।
লভ্যাংশেই ৫৫ শতাংশ : শেষ প্রান্তিকে করবহির্ভূত রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল লভ্যাংশ। এপ্রিল-জুন সময়ে এ খাত থেকে সরকারের আয় হয়েছে ১০৩৬১ কোটি টাকা। মোট করবহির্ভূত রাজস্বের ৫৫ দশমিক ২ শতাংশই এসেছে লভ্যাংশ থেকে। সুদের আয় থেকে এসেছে ২০৬৭ কোটি টাকা, যা মোটের ১১ শতাংশ। প্রশাসনিক ফি থেকে আদায় হয়েছে ১৯৮৬ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়া অ-আর্থিক সম্পদ বিক্রি থেকে ১০৫৩ কোটি, ভাড়া ও অংশীদারি থেকে ৩৯১ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ২৯১৭ কোটি টাকা এসেছে। অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকের করবহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধির মূল ভরসা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ, সুদ ও প্রশাসনিক ফি।
করবহির্ভূত রাজস্বের এই প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এক প্রান্তিকের মোট আদায়ের অর্ধেকের বেশি এসেছে লভ্যাংশ থেকে। আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে লভ্যাংশের পরিমাণ প্রতিবছর একই থাকবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, করবহির্ভূত রাজস্বের এই বড় প্রবৃদ্ধি উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এটি সরকারের টেকসই রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বেড়েছে-এমনটা বলা যায় না। তাঁর মতে, লভ্যাংশ ও অন্যান্য অনিশ্চিত উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিয়মিত কর আদায় বাড়ানো এবং রাজস্বের ভিত্তি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
৬৫০০০ কোটি টাকার লক্ষ্য : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫০০০ কোটি টাকা। এটি মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ১ শতাংশ। এদিকে, পুরো অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৮১ শতাংশ আদায় হয়েছে।
এনবিআরের বাইরের করেও বাড়তি আয় : করবহির্ভূত রাজস্বের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বাইরে সংগৃহীত কর রাজস্বও শেষ প্রান্তিকে বেড়েছে। এপ্রিল-জুন সময়ে এনবিআরের বাইরে কর রাজস্ব আদায় হয়েছে ২০ বিলিয়ন টাকার বেশি। জানুয়ারি-মার্চে এ খাতে আদায় হয়েছিল ১৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন টাকা। ফলে এক প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এ খাতের সবচেয়ে বড় উৎস স্ট্যাম্প শুল্ক। এপ্রিল-জুনে স্ট্যাম্প শুল্ক থেকে এসেছে ১৪৫৭ কোটি টাকা, যা মোট এনবিআর-বহির্ভূত কর রাজস্বের ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। পণ্য ব্যবহারের ওপর কর থেকে এসেছে ৫ দশমিক ০২ বিলিয়ন টাকা এবং মাদক ও মদ শুল্ক থেকে ৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
রাজস্ব বাড়াতে ব্যবস্থাপনায় জোর : বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআরের বাইরে কর এবং করবহির্ভূত রাজস্ব-উভয় ক্ষেত্রেই আরও আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর-অনুবর্তিতা বাড়ানো, রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা গেলে এসব উৎস থেকে আয় বাড়তে পারে। তবে শেষ প্রান্তিকে করবহির্ভূত রাজস্বের প্রায় ৩ গুণ প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ী রাজস্ব সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ, এই উল্লম্ফনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল লভ্যাংশ। তাই সাময়িক এই স্বস্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব সক্ষমতায় রূপ দিতে হলে নিয়মিত কর আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন রাজস্ব উৎস চিহ্নিত ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপরই জোর দিতে হবে।