ফুটবল। পেলে বলেছেন, ফুটবল হলো সুন্দর খেলা (ফুটবল ইজ দ্য বিউটিফুল গেম)। ইয়োহান ক্রুইফ বলেছেন, ফুটবল শুধু খেলা নয়, এটি একটি শিল্প। আর বিশ্বকাপ ফুটবল? প্রতি চার বছরে একবার পুরো পৃথিবী ভাষা, সংস্কৃতি ও সীমান্ত ভুলে একটি বলের পেছনে একত্রিত হয়। এ উৎসবের নামই বিশ্বকাপ। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ট্রফি। কোটি কোটি মানুষের আবেগের নাম বিশ্বকাপ। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল এ টুর্নামেন্টের। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বকাপ পূর্ণ করল ৯৬ বছর। প্রায় এক শতকের এই যাত্রায় বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বিশ্ব সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।


প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল উরুগুয়ের মাটিতে। মাত্র ১৩টি দল অংশ নিয়েছিল সেই আসরে। স্বাগতিক উরুগুয়েই প্রথম চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে। তখন কেউ ভাবেনি, একদিন এ টুর্নামেন্ট পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরে পরিণত হবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। ১৯৫৮ সালে তরুণ পেলের আবির্ভাব বিশ্বকাপকে নতুন মাত্রা দেয়। পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরও কিছু নাম কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।


দিয়েগো ম্যারাডোনা ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন প্রায় একক নৈপুণ্যে। আর আধুনিক যুগে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানোর মতো তারকারা বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা কেবল বাড়িয়েছেন। বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের তালিকায় ব্রাজিলের পরই যৌথভাবে আছে জার্মানি ও ইতালি। দুটি দলই চারবার করে বিশ্বকাপ জয় করেছে। এপর আর্জেন্টিনা (তিনবার), ফ্রান্স (দুবার), উরুগুয়ে (দুবার), ইংল্যান্ড (একবার) এবং স্পেন (একবার)।


ফুটবলবিশ্বকাপ শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বেদনার গল্পও। ১৯৫০ সালে মারাকানার ট্র্যাজেডি, ১৯৭৪ সালে ইয়োহান ক্রুইফের স্বপ্নভঙ্গ, ২০১৪ সালে ফাইনালে মেসির পরাজয়, এসব মুহূর্তও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। জাস্ট ফন্টেইনের এক আসরে ১৩ গোল, লেভ ইয়াশিনের অবিশ্বাস্য গোলকিপিং আর বিশ্বকাপ ফাইনালে জিওফ হার্স্ট ও কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্র্রিক। বিশ্বকাপ মানে পুরো পৃথিবীর এক হয়ে যাওয়া। সংস্কৃতির মেলবন্ধন তৈরি হওয়া। হাজার হাজার মাইল দূরের দেশ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের পতাকা বাংলাদেশে। বিশ্বকাপের ফ্যান জোনে বিশ্বের মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে উপস্থিত হয়। কেউ গান গায়, কেউ নেচে বেড়ায় কেউবা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে থাকে। আবার কেউ নীরবে-নিশ্চুপে ফুটবলের আনন্দ উপভোগ করে।


গত ৯৬ বছরে বিশ্বকাপে নানা পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির ব্যবহারেও এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় সাদা-কালো টেলিভিশনে দেখা ম্যাচ এখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে উচ্চমানের সম্প্রচারে পৌঁছে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিএআর প্রযুক্তি রেফারিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বকাপের পরিধিও বেড়েছে সময়ের সঙ্গে। ১৯৩০ সালে ১৩ দল দিয়ে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতায় এখন অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। ২০২৬ সালের আসর হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।


এ ৯৬ বছরে বিশ্বকাপ অসংখ্য নায়ক জন্ম দিয়েছে। অসংখ্য স্বপ্ন ভেঙেছে। আবার নতুন স্বপ্নও তৈরি করেছে। প্রতি চার বছর পরপর পৃথিবী যেন এক সুতোয় গাঁথা পড়ে ফুটবলের এ মহোৎসবে। ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাস শিখিয়েছে ফুটবলে কিছুই অসম্ভব নয়। একটি গোল বদলে দিতে পারে একটি দেশের ইতিহাস। একটি ম্যাচ তৈরি করতে পারে নতুন কিংবদন্তি। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি বিশ্ববাসীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব।


শতবর্ষের পথে এগিয়ে চলা বিশ্বকাপ এখনো একই রকম রোমাঞ্চকর। একই রকম আকর্ষণীয়। আর সেই আকর্ষণই প্রতি চার বছর পর পৃথিবীকে আবারও ফুটবলের প্রেমে ডুবিয়ে দেয়। পেলে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপই ভালো খেলোয়াড় আর মহান খেলোয়াড়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে।’ বিশ্বকাপ ট্রফির স্পর্শ একজন সাধারণ ফুটবলারকেও কিংবদন্তি করে তোলে। এবারের বিশ্বকাপে কে হবেন কিংবদন্তি? কার হাত স্পর্শ করবে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি?