বিশ্বকাপ মানেই লাতিন আমেরিকা কিংবা ইউরোপের ট্রফি জয়ের গল্প। গত ৯৬ বছরে এ দৃশ্যই দেখেছে ফুটবল দুনিয়া। লাতিন আমেরিকার তিন দল মিলে ১০ বার এবং ইউরোপের পাঁচ দল মিলে ১২ বার বিশ্বকাপের শিরোপা ভাগাভাগি করেছে। আফ্রিকা, এশিয়ার কোনো দল এখনো পর্যন্ত ফাইনালই খেলতে পারেনি। দক্ষিণ কোরিয়া একবার সেমিফাইনাল খেলেছে এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে। গত বিশ্বকাপে মরক্কো সেমিফাইনাল খেলেছে আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে। অতীতের সেই ধারাবাহিক গল্পগুলো কি বদলে যাবে এবার উত্তর আমেরিকায়? মরক্কো কি নতুন এক বার্তা দিল গতকাল ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলে?
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল প্রতিবারই ‘হেক্সা’ জয়ের মিশন নিয়ে বিশ্বকাপে যায়। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকেই ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের। এবার কার্লো আনচেলত্তির মতো বিশ্ববিখ্যাত কোচের কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে বেশ আশাবাদী ব্রাজিল। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেয়েছে হলুদ জার্সির দল। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে। তবে ফলের চেয়েও বড় বিষয় ছিল ম্যাচে ব্রাজিলের খেলার ধরনে। মাঝ মাঠে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি তারা। আক্রমণের পরিসংখ্যান সামনে রাখলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। ব্রাজিলের গোলমুখে ১৩ বার আক্রমণ করেছে মরক্কো। বিপরীতে মরক্কোর গোলমুখে ব্রাজিলের আক্রমণ ছিল ৮টি। ডিফেন্সে মরক্কো ১৬টি ট্যাকল করে প্রতিবারই বল দখলে নিয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিল কেবল ৭০ ভাগ ট্যাকলে সফল হয়েছে। ব্রাজিলের কাসেমিরো এবং রজার ইবানেজ দেখেছেন হলুদ কার্ড। গ্রুপ পর্বে তারা আরেকবার হলুদ কার্ড দেখলেই নকআউটে বিপদে পড়বেন আনচেলত্তি। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করায় অবশ্য এমনিতেই বিপদে আছে ব্রাজিল। পরের দুই ম্যাচে জয়ের বিকল্প নেই তাদের।
একদিকে ব্রাজিল যেমন বিপদে। অন্যদিকে মরক্কো ঠিক তেমনি আছে আনন্দে। ব্রাজিলের মতো দলের সঙ্গে একটা পয়েন্ট পাওয়ায় গ্রুপ পর্বে বেশ সুবিধাজনক স্থানে আছে দলটি। এই দলের বেশ কজন ফুটবলার নজর কেড়েছেন গতকাল। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি এবং ব্রাহিম ডিয়াজ ছিলেন বরাবরের মতোই উজ্জ্বল। তবে ইসমাইল সাইবারি এবং আইয়ুব বুয়াদ্দি নতুন করে নিজেদের চিনিয়েছেন। বুয়াদ্দি মাত্র মাসখানেক আগে মরক্কো জাতীয় দলের জার্সিতে খেলার ছাড়পত্র পেয়েছেন। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া মরক্কোর বংশোদ্ভূত এই তারকা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফরাসি ক্লাব লিলিতে খেলছেন বুয়াদ্দি। ইসমাইল সাইবারি ব্রাজিলের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করেছেন। তিনি খেলছেন ডাচ ক্লাব পিএসভিতে। ২০২৩ সাল থেকে মরক্কো জাতীয় দলে খেলছেন। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন ইসমাইল সাইবারি।
মরক্কো উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার এক দেশ। পশ্চিম সাহারার এক বিরাট অংশ মরক্কোতে। প্রায় সাড়ে চার লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশে মাত্র সাড়ে ৩ কোটির কিছু বেশি মানুষের বসবাস। ইউরোপের খুব কাছাকাছি থাকায় মরক্কোর মানুষের মাঝে তার প্রভাব বেশ লক্ষ করা যায়। ফুটবলেও ইউরোপিয়ান স্টাইল দেখা যায়। মরক্কো দলের ২০ ফুটবলার ইউরোপের বিখ্যাত ক্লাবগুলোতে খেলছেন। সৌদি আরব লিগে খেলা গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো তারকাখ্যাতি পেয়েছেন বহু আগেই। মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহদির হাতে বিকল্পের অভাব নেই। এবারের বিশ্বকাপে রূপকথা লেখার মতোই এক দল। কিন্তু তা কি পারবেন আশরাফ হাকিমিরা?