চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা মোড়। এক মাছ বিক্রেতা সামুদ্রিক পোয়া মাছ বিষাক্ত রং মেশানো পানিতে ডুবিয়ে পাশের খাঁচায় সাজিয়ে রাখছেন। মাছগুলোকে তাজা দেখানোর জন্য এ কাজটি করা হয়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এ দৃশ্যটি দেখা যায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা পচা বা বাসি মাছকে তাজা দেখাতে টেক্সটাইল বা কাপড়ের ক্ষতিকর রং ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ আছে।
শুধু এখানে নয়, নগরের বিভিন্ন বাজারে অসাধু মাছ বিক্রেতারা কাজটি প্রকাশ্যেই করছেন। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এমন মাছ খেয়ে মানুষের কিডনি বিকল, ক্যানসার আক্রান্তসহ জটিল রোগ হওয়ার আশঙ্কা আছে। সরকারিভাবে নিয়মিত তদারকির অভাবে মাছ বিক্রেতারা ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে।
আন্দরকিল্লা মোড়ের প্রত্যক্ষদর্শী জিয়াউল কবির সোহেল বলেন, আমার চোখের সামনেই বালতির রং মিশ্রিত পানিতে মাছ ডুবিয়ে রঙিন করছে। ক্রেতারা যাতে বোঝেন এগুলো তাজা মাছ। আন্দরকিল্লা মোড়ের মতো একটি জনবহুল জংশনে কাজটি অসাধু ব্যবসায়ীরা দেদার করছে। এভাবেই জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রং মিশিয়ে বাজারে মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। এগুলো কঠোরভাবে মনিটরিং করা উচিত।
প্রকাশ্যে রং মাখানো মাছ বিক্রিজনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম ও টেক্সটাইল রঙে সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির অপূরণীয় ক্ষতি করে। তা ছাড়া হজম ও পেট সংক্রান্ত সমস্যার ফলে খাবারের পর গলা-বুক জ্বালাপোড়া, বদহজম, বমি বমি ভাব এবং পেটে ভারী বোধ হতে পারে। সঙ্গে আছে ক্যানসারের ঝুঁকি। কারণ মাছে ব্যবহৃত অনেক সস্তা রাসায়নিক ও কার্সিনোজেনিক উপাদান মানবদেহে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তা ছাড়া অ্যালার্জি, চর্মরোগও দেখা দেয়। এই রাসায়নিক বিষক্রিয়ার কারণে শরীরে চুলকানি, র্যাশ বা ত্বকের নানা ধরনের অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, কাপড়ের রং মিশ্রিত এসব মাছ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই রংগুলোতে প্রায়শই ক্যানসার সৃষ্টিকারী এবং বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অজয় দেব বলেন, এমন রং মিশ্রিত মাছ শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকি। এর মাধ্যমে কিডনি বিকল, ক্যানসার হওয়া, চর্ম রোগ ও পেটের নানা সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসার সালমা বেগম বলেন, মাছে রং মিশিয়ে বিক্রি করা এটি জঘন্য একটি নিন্দনীয় কাজ। এটি কোনো মতেই মানার মতো বিষয় নয়। কারণ এটি মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নগরের মাছ বাজারগুলো নিয়মিতই তদারকি করা হয়। এমন কিছু দেখতে পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগামীতে মনিটরিং আরও কঠোর করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের বড় খুচরা বাজারগুলোতে এমন কাজ প্রায় নিয়মিতই হয়। রেয়াজুদ্দিন বাজার, কাজির দেউড়ি বাজার, বহদ্দারহাট, চকবাজার, সিরাজউদ্দৌলা রোড বাজার, আগ্রাবাদ লাকী প্লাজার সামনের বাজার, আতুরার ডিপোসহ নগরের সব বাজারে এভাবে কাপড়ের রং মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।