‘মোবাইলটা হাতে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ঢুকলে প্রায়ই জুয়ার বিজ্ঞাপন সামনে আসত। কৌতূহল থেকেই বিজ্ঞাপনে ক্লিক করি। পরে একটি ওয়েবসাইটে গিয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করি। বোনাস টাকাও দেয়। সেই টাকার লোভে খেলা শুরু করে প্রথমদিকে বেশ লাভ হতো। এরপর ধীরে ধীরে সময় পেলেই খেলতে ইচ্ছে করে। আর এখন চেষ্টা করেও বের হতে পারি না। লোকসান হলেও নেশায় বুঁদ হয়ে থাকি।’ কথাগুলো বলছিলেন অনলাইন জুয়ায় আসক্ত সুমন (ছদ্মনাম) নামে এক যুবক। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ের একটি চায়ের দোকানে। অনলাইন জুয়ায় আসক্তির কথা জানালেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই যুবক বলেন, ‘আমার মতো এরকম অনেকেই আছে।’


অনলাইনে জুয়া খেলা আরেক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। মাঝেমধ্যে খেলে সময় কাটান। সাধারণত কাজের চাপ থাকলে খেলা হয় না। খেলা শুরুর প্রথম দিকের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেসবুকে এক বন্ধুর পাঠানো লিংক থেকে খেলা শুরু। লিংকের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে ৩০০ টাকার মতো বোনাস দিয়েছিল। সেই বোনাস থেকেই খেলা শুরু। স্থানীয়ভাবে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থী, বেকার ও তরুণ চাকরিজীবীদের একটি অংশ বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। পরিচিতজনের মাধ্যমে পাওয়া লিংক, সামাজিক মাধ্যমের গ্রুপ এবং বিভিন্ন অ্যাপের বিজ্ঞাপন থেকে এসব প্ল্যাটফর্মের সন্ধান মিলছে। শুরুতে ‘সহজে আয়’ বা ‘ম্যাচ জিতে টাকা’ পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হলেও শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজীউর রহমান বলেন, ক্রিকেট-ফুটবল ম্যাচ ঘিরেই মূলত বেশি অনলাইন জুয়া চলে। প্রথমে অল্প টাকা দিয়ে খেলতে গিয়ে কেউ কেউ সামান্য লাভের মুখ দেখছেন। সেই লাভই পরে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। একপর্যায়ে হারানো টাকা উদ্ধারের আশায় আরও বেশি অর্থ ঢালছেন অনেকে। এভাবেই অনলাইন জুয়ার নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন রাজশাহীর এক শ্রেণির তরুণরা।


অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে নগর পুলিশের মুখপাত্র বলেন, ‘অনেকেই অনলাইনে বিভিন্নভাবে প্রলোভনে পড়ে প্রতারিত হয়। নগরীর বিভিন্ন থানায় এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে জিডি ও মামলা করেন। সংশ্লিষ্ট থানা থেকে এটা আমাদের কাছে চলে আসে। আমাদের তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের খুঁজে বের করে, পরবর্তী যেসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ নগর পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জুয়া চালানো ও খেলার অভিযোগে গত দেড় মাসে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৮টি। এর মধ্যে ১০ আগস্ট নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানার কোর্ট স্টেশন মোড় এলাকায় বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত আসাদুজ্জামান রনি (৩০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনায় ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। গত ১৪ আগস্ট ভোর আনুমানিক সোয়া ৪টার দিকে আরএমপির বিশেষ টিম কাশিয়াডাঙ্গা থানার হড়গ্রাম চারখুটার মোড় এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় গোলজারবাগ গুঁড়িপাড়া গ্রামের রাজা হোসেন (৪৫) এবং জেলার গোদাগাড়ী থানার গোপালপুর গ্রামের ইয়ার লতিফ চঞ্চলকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের হেফাজত থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনা ও খেলার কাজে ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। একই দিন রাত আনুমানিক সোয়া ১২টার দিকে আরএমপির বিশেষ টিম নগরীর রাজপাড়া থানার দাশপুকুর আইডি বাগানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. জিতু (২১) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার কাছ থেকেও অনলাইন জুয়া পরিচালনা ও খেলার কাজে ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।  এদিকে অনলাইন জুয়ার বিস্তারে সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করেছেন সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রবিউল আলম। তিনি বলেন, বিভিন্ন অনলাইন পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে বেটিংয়ের লিংক ছড়ানো হয়। কোথাও কোথাও ‘বোনাস’, ‘ফ্রি বেট’ কিংবা দ্রুত লাভের কথা বলে নতুন ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব প্ল্যাটফর্মের অনেক দেশের বাইরে পরিচালিত হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে ব্যবহারকারী শনাক্ত করা গেলেও মূল পরিচালনাকারী চক্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।