জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের শিল্প খাতে এক বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। যার প্রভাব সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের এ মূল্যবৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশনে প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রান্তিক ভোক্তাদের।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলী হুসাইন আকবর আলী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে করা উচিত। কারণ দেশের শিল্পকারখানার মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে জ্বালানি তেল। এটার দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে। আমরা চাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে তেলের দাম সমন্বয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ চেইন নির্বিঘ্ন হোক।’
ডায়মন্ড সিমেন্টের জেনারেল ম্যানেজার (বিপণন) আবদুর রহিম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রামের শিল্প খাত এক কঠিন সময় পার করছে। এ সংকট উত্তরণে সরকার যদি দ্রুত বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা, শিল্প খাতে বিশেষ নীতিগত সহায়তা প্রদান না করে, তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসংস্থানে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জানা যায়, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বা বড় জেনারেটর চালাতে হয়, যা মূলত ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলনির্ভর। তেলের দাম বৃদ্ধিতে জেনারেটর চালানোর খরচ বেড়েছে অনেকাংশ, যা সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়ে। এ ছাড়াও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বেড়েছে কারখানার দৈনন্দিন লজিস্টিক খরচ এবং সাপ্লাই চেইনের অন্যান্য ধাপের ব্যয়। কারখানার কাঁচামাল বন্দর থেকে কারখানায় নেওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য সারা দেশে বা বন্দরে পৌঁছে দিতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ওপর নির্ভর করতে হয়। দাম বাড়ায় এক ধাক্কায় পণ্য পরিবহন ভাড়া ক্ষেত্রবিশেষে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ফলে সার্বিক উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। তেলের দাম বৃদ্ধিতে বড় আঘাত লেগেছে ইস্পাত খাতে। দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ প্রায় ১০-১৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে চট্টগ্রামের শত শত পোশাক কারখানা এখন তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ভোগ্যপণ্য প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং চামড়াশিল্পেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে কাঁচামাল ও ফিনিশড গুডস ডিস্ট্রিবিউশনে ট্রাকের ভাড়া বাড়ায় এসব পণ্যের বাজারমূল্য ও উৎপাদন ব্যয় দুই-ই বেড়ে গেছে। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে এ অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্প হাব। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সর্বশেষ তথ্যমতে, চট্টগ্রামে তাদের সদস্যভুক্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা প্রায় ৬৯৯টি। এ ছাড়াও ভারী ও মাঝারি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি রয়েছে ১০টি, সরকারি ও বেসরকারি জুট মিল রয়েছে ২৪টি, ছোটবড় মিলিয়ে ইস্পাত ও রি-রোলিং মিল রয়েছে অর্ধশতাধিক।