দেশের জুয়েলারি শিল্পের উন্নয়ন ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বর্ণ ও ডায়মন্ড বিক্রয়ের ওপর আরোপিত ভ্যাটের হার যৌক্তিকীকরণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সংগঠনটি বর্তমানে বিদ্যমান শতাংশভিত্তিক ভ্যাটের পরিবর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ বা ‘ফিক্সড ভ্যাট’ প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে।


গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পলিসি কো-অর্ডিনেশনের চেয়ারম্যান এবং বাজুসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাজুসের পরিচালক ফাহাদ কামাল লিংকন। প্রাক-বাজেট আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।


মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বাজেট প্রস্তাবনায় বলেন, ভ্যাট হার যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে জুয়েলারি বিক্রয়ের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। কিন্তু জুয়েলারি খাতে গড় গ্রস মার্জিন প্রায় ৫ শতাংশ। ৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণের সময় ভরি প্রতি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু মূল্য সংযোজন অনুপাতে বাড়েনি। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৮ হাজার ভ্যাটের আওতায় থাকায় নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এজন্য শতাংশভিত্তিক ভ্যাট বাতিল করে ফিক্সড ভ্যাট নির্ধারণ করা প্রয়োজন। স্বর্ণালংকারের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ২ হাজার টাকা এবং ডায়মন্ডের অলংকারে ব্যবহৃত ডায়মন্ডের প্রতি ক্যারেটে ২ হাজার টাকা।


তিনি বলেন, বর্তমানে পণ্যের মূল্য প্রদর্শনের সময় ভ্যাট আলাদাভাবে যোগ করা হয়। বিল করার সময় অতিরিক্ত ভ্যাট যুক্ত হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট এড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে বাজুস ভ্যাট ইনক্লুসিভ মূল্য নির্ধারণ করার প্রস্তাব করে। এ ছাড়া উৎসে মূসক প্রত্যাহার ও মূসক ফরম সহজ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ডায়মন্ড আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে ডায়মন্ড প্রসেসিং শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পলিসি কো-অর্ডিনেশনের চেয়ারম্যান বলেন, স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রেও বর্তমানে কার্যকর আমদানিকারকের সংখ্যা সীমিত থাকায় জুয়েলারি খাতে কাঁচামালের সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, যা অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক আমদানি উৎসাহিত করছে। এ প্রক্রিয়ায় পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালার আওতায় স্বর্ণালংকার ও রৌপ্য অলংকার আনয়নের পূর্বের বিধান সাময়িকভাবে বহাল রাখার প্রস্তাব জানান। এ ছাড়া নিষ্ক্রিয় লাইসেন্সধারীদের বাদ দিয়ে যোগ্য উদ্যোক্তাদের স্বর্ণ আমদানিকারক লাইসেন্স প্রদানের উদ্দেশ্যে দরপত্র আহ্বান করার মাধ্যমে আমদানিকারকের পরিধি বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জানান তিনি।


আয়কর বিষয়ে প্রস্তাবনায় বাজুস জানায়, বর্তমানে মোট বিক্রয়ের ওপর ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর আরোপ রয়েছে। ন্যূনতম করের হার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা। এ ছাড়া বর্তমানে সরবরাহের ওপর ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর কর্তন করা হয়। একটি চালানে ব্যবসায়ীর নিট মুনাফা থাকে ৩ থেকে ৪ শতাংশ, সেখানে মোট বিলের ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তন ব্যবসার বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।


বাজুস জুয়েলারি খাতে সরবরাহের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর প্রত্যাহার করার দাবি জানায়। এ ছাড়া স্বর্ণমেলা আয়োজন এবং অঘোষিত সম্পদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানানো হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান প্রস্তাব শুনে যাচাইবাছাই করে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেন।


এ ছাড়া গতকাল প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি, অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক সমিতি, বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।