পেট্রোল-অকটেন উৎপাদনে বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা থাকার পরও ফিলিং স্টেশনগুলোতে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না পেট্রোল-অকটেন। পাম্প মালিকরা জানান, দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেলের তেমন সংকট নেই। সংকট মূলত পেট্রোল ও অকটেন নিয়েই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পেট্রোল ও অকটেনের সংকটের পেছনে কাজ করছে চারটি কারণ। প্যানিং বায়িং থেকে ক্রেতারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেট্রোল-অকটেন কিনছেন। কিছু অসাধু চালক ও চক্র অবৈধভাবে তেল মজুত করায় এই সংকট হচ্ছে। গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া কনডেনসেটও (গ্যাস উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া বর্ণহীন তরল হাইড্রোকার্বন) কম পাওয়া যাচ্ছে। যা পেট্রোল-অকটেনের দেশীয় উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া ক্রুড ওয়েলের সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিতে পেট্রোল উৎপাদন বন্ধ এবং রিফাইনারির দুর্বল অবকাঠামোর জন্যও সংকট তৈরি হচ্ছে।
দেশে ব্যবহৃত ডিজেলের পুরোটাই বাইরে থেকে আমদানি করতে হলেও পেট্রোল ও অকটেন দেশেই উৎপাদিত হয়। তেলের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা মিলে পেট্রোল-অকটেনের সংকট হওয়ার কথা নয়। গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন করা কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রোল উৎপাদন হলেও অকটেনে আমদানিনির্ভরতা আছে। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারি অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে অকটেনের চাহিদার পুরোটা দেশীয় উৎস থেকে পূরণ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোল বিক্রি হয় ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ মেট্রিন টন। এর পুরোটাই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন সক্ষমতা বেশি না থাকায় বেসরকারি চারটি ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট (সিআরইউ) ও একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও পেট্রোল উৎপাদন করা হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়। স্থানীয় চারটি বেসরকারি সিআরইউ প্ল্যান্ট ও রশিদপুর তিন হাজার বিপিডি সিআরইউ প্ল্যান্টের মাধ্যমে অকটেন সংগ্রহ করা হয়। তবে এ দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এর বাইরে বিপিসির চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অকটেন আমদানি করা হয়। আবার অকটেনের চাহিদাও গত পাঁচ বছরে বেড়েছে। নিজস্ব কনডেনসেট থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে সিলেট গ্যাস ফিল্ড। সিলেটের দুটি প্ল্যান্টে দিনে সাড়ে সাত হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা আছে। তবে গ্যাসের উৎপাদন ও কনডেনসেট উৎপাদন কম হওয়ায় এখন দিনে সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বরাদ্দ পায় সিলেট গ্যাস ফিল্ডের কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (্এসজিএফএল) এর লিকুইড পেট্রোলিয়াম মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, হবিগঞ্জে অবস্থিত এসজিএফএল এর ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট থেকে দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ ব্যারেল অকটেন এবং ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৪৫০ ব্যারেল পেট্রোল উৎপাদন হচ্ছে। এই সরবরাহকৃত জ্বালানি দেশের মোট পেট্রোলের চাহিদার ৩৩ থেকে ৩৫ শতাংশ ও অকটেনের চাহিদার ৭ থেকে ৮ শতাংশ। ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে বাংলাদেশে পেট্রোল আমদানির প্রয়োজন পড়ে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে মোট পেট্রোলের চাহিদার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। আর বাকিটা ইস্টার্ন রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ ক্রুড ওয়েল থেকে এবং বেসরকারি যারা আছে তারা আমদানিকৃত কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পেট্রোল আমদানি করতে না হলেও মোট চাহিদার প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন অকটেন আমাদের আমদানি করতে হয় যা মোট চাহিদার অর্ধেক। পেট্রোল সংকটের অন্যতম কারণ হচ্ছে যে রিফাইনারি থেকে পেট্রোল আসে সেখানে ক্রুড ওয়েল নেই। এর ফলে পেট্রোল উৎপাদনও বন্ধ। আবার গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কনডেনসেট উৎপাদনও কমে গিয়েছে। এর সঙ্গে রিফাইনারি বন্ধ হওয়ার অবস্থা তৈরি হওয়ায় সংকট বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামনে ১৭ হাজার টনের অকটেনের জাহাজ আসছে। এটি কিছুটা স্বস্তির। ডিজেলের জন্য পাম্পগুলোতে এত লম্বা লাইন আমরা দেখছি না। মানুষ এখন আতঙ্কিত হয়েও বেশি তেল কিনছেন। পাম্প থেকে বলা হচ্ছে চাহিদা এখন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। কিছুটা মজুতদারিরও ঘটনা ঘটছে। প্রাইভেট গাড়িচালকরা তাদের গাড়ির ট্যাংক সব সময় ভরে রাখার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে অতিরিক্ত চাহিদাই পেট্রোল-অকটেন সংকটের মূল কারণ। আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও চালকদের অবৈধ মজুতদারি এবং প্যানিং বায়িং এর কারণেও পাম্পে এই দুই ধরনের জ্বালানি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের পাম্পগুলোতে এখন যে পরিমাণ তেল বরাদ্দ পাচ্ছি ক্রেতাদের চাহিদা এর থেকে আরও অনেক বেশি। মোটরসাইকেলে তেল নেওয়ার চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে সরকার রেশনিং করে পাম্পগুলোতে তেল দিচ্ছে আমরাও রেশনিং করে ক্রেতাদের তেল দিতে বাধ্য হচ্ছি। আমি ৫০ বছর তেল ব্যবসায় জড়িত কিন্তু এর আগে কখনো মানুষকে এত অস্বাভাবিক তেল কিনতে দেখিনি।