আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এই উদ্যোগ প্রায় ১ কোটি ক্ষুদ্র ও মধ্যম আয়ের আমানতকারীকে সরাসরি স্বস্তি দিতে পারে। তবে এর প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজস্ব নীতি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার আমানতের ওপর ১৫০ টাকা আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের বাস্তব আয় কমে গেছে। ফলে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের ওপর করের চাপ কমানো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। কর ছাড়ের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণভাবে আবগারি শুল্কমুক্ত করা হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কর ছাড়কে শুধু সামাজিক সহায়তা নয়, বরং একটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বর্তমানে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যাংক আমানতের ওপর ৫০০ টাকা। ১০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা আমানতের ওপর ৩,০০০ টাকা। ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা আমানতের ওপর ৫,০০০ টাকা। ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা আমানতের ওপর ১০,০০০ টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি আমানতের ওপর ২০ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক কাটা হয়।
ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে আবগারি শুল্কের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। বেসরকারি খাতের মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন এই শুল্ক বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার কাটা হয়। নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার শুল্ক কাটার কথা থাকলেও, এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তরের সময় এটি পুনরায় কাটা হয়। যা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। ফলে কর কাঠামোটি অনেক সময় প্রকৃত করের চেয়ে বেশি বোঝা সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতা কর ছাড়ের যৌক্তিকতাকে আরও শক্তিশালী করে। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাত দ্রুত বিস্তৃত হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব থাকলেও, এদের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় বা কম ব্যবহৃত। কর ছাড়ের ফলে নতুন আমানতকারী ব্যাংকে আসতে উৎসাহিত হতে পারে। ক্ষুদ্র সঞ্চয় বৃদ্ধি পেতে পারে। ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন বাড়তে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু কর নীতি নয়, বরং আর্থিক ব্যবস্থার গভীরতা বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হতে পারে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এই কর ছাড়ের ফলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে সরকার। স্বল্পমেয়াদে এটি রাজস্বে চাপ সৃষ্টি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে যদি নতুন করদাতা ও আমানতকারী তৈরি হয়, তবে তা রাজস্ব ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, কর ফাঁকি রোধ, ব্যাংকিং লেনদেনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, অন্যথায় এটি শুধু একটি রাজস্ব ছাড় হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে প্রথমত, কর কাঠামোর সংস্কার শুধু সীমা বাড়ালেই হবে না, পুরো আবগারি শুল্ক ব্যবস্থাকে যৌক্তিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাস্তব প্রয়োগ একাধিকবার শুল্ক কাটা বন্ধ করতে না পারলে কর ছাড়ের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, বড় আমানতকারীরা যেন ছোট অ্যাকাউন্টে বিভক্ত করে এই সুবিধার অপব্যবহার না করে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের করনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে। কর আদায়ের পাশাপাশি করদাতার সক্ষমতা ও বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
যদি এটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এটি হতে পারে ক্ষুদ্র সঞ্চয় বৃদ্ধির চালিকাশক্তি, ব্যাংকিং অন্তর্ভুক্তির নতুন ধাপ এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক সংস্কার। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য আবগারি শুল্ক মওকুফ একটি স্বস্তির পদক্ষেপ হলেও এটি একই সঙ্গে একটি পরীক্ষাও-বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে করনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে একসয়েমড় এগিয়ে নিতে পারে।