কারও মুখ, কারও শরীর, কারও হাত কিংবা কপাল দগ্ধ। ব্যান্ডেজে জড়িয়ে তাদের রাখা হয়েছে হাসপাতাল বেডে। তারা এমনভাবে কাতরাচ্ছে যাতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। দগ্ধ শিশুদের দিকে তাকালেই শিউরে উঠতে হয়।


চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহরের এইচ ব্লকের এসি মসজিদসংলগ্ন এলাকায় ছয় তলা হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয় তলায় গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছে নয়জন। এদের মধ্যে একজন ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা গেছেন। তার নাম রাণী আক্তার (৪০)। গতকাল সাহরির আগে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।


দগ্ধ অন্য আটজনের সবার অবস্থায়ই আশঙ্কাজনক। নারী-শিশুর মধ্যে আয়েশা আক্তার (৪), মো. আনাস (৭) ও উম্মে আইমনের (১০) অবস্থা সবচেয়ে করুণ। দগ্ধদের সবাইকে গতকাল সকালে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। দুপুরের দিকে বেশি সংকটাপন্নদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। বিস্ফোরণে দগ্ধরা হলো শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩২), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), উম্মে আইমন (১০), আয়েশা আক্তার (৪), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০)। সবাই একই পরিবারের সদস্য। কুমিল্লার বুড়িচং থেকে ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিল তারা। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয় তলার একটি বাসায় জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আগুন ধরে যায়। আগুন ভবনটিতে ছড়িয়ে পড়ে। বাসায় থাকা শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হয়। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুরো ভবন। দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দরজা ভেঙে গেছে। ছিঁড়ে গেছে ভবনের লিফটও। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছার আগেই স্থানীয়রা দগ্ধদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বাসাটিতে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয় না। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাসের সংযোগ আছে। প্রাথমিক ধারণা, কোনো কারণে চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়ে রান্নাঘরে জমে যায়। সেই গ্যাসেই বিস্ফোরণ হয়।’ চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, দগ্ধ সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালি শতভাগ পুড়ে গেছে। শিপনের শ্বাসনালির ৮০ শতাংশ পুড়েছে। সুমন ও শাওনের পুড়েছে ৪৫ শতাংশ। আনাস, উম্মে আইমন ও আয়েশা আক্তারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। বার্নের ক্ষেত্রে শিশুদের ১০ আর অ্যাডাল্টের ১৫ পারসেন্টের ওপরে গেলে সংকটাপন্ন অবস্থা বলে বিবেচনা করেন চিকিৎসকরা। দরকার হতে পারে আইসিইউর। দগ্ধদের স্বজনরা বলেছেন, আহত অনেকের অবস্থা খারাপ। যেকোনো সময় আইসিইউ দরকার হতে পারে, যা চমেক হাসপাতালে নেই। তাই চিকিৎসকরা দগ্ধদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দগ্ধ সবারই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবার অবস্থাই সংকটাপন্ন। তাই তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউ দরকার হতে পারে। চমেকে সে ব্যবস্থা নেই। তবে বর্তমানে ১৫০ শয্যার একটি পৃথক বার্ন ইনস্টিটিউট নির্মাণের কাজ চলছে।’ প্রসঙ্গত, বর্তমানে চমেক হাসপাতালের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ২৬ শয্যার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে দগ্ধদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিনিয়তই শয্যার বাইরে মেঝে ও ফ্লোরে রোগী রাখা হয়। গড়ে ভর্তি থাকে ৭০-৭৫ জন। প্রতিদিন নতুন রোগী আসে ১৫ জন। আগুন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণসহ নানান কারণে দগ্ধ রোগী বাড়ছে। কিন্তু ওয়ার্ডে নেই আইসিইউ শয্যাসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা উপকরণ। ফলে দগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে হয় ঢাকায়। গতকালও দগ্ধদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়।