জ্বালানি তেল এবং এলপিজির বাড়তি মূল্যে গ্রাহকরা আগে থেকেই দিশাহারা। এর মধ্যে নতুন করে গ্রাহকের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াতে যাচ্ছে বিদ্যুতের বাড়তি বিল। আগামী ২০ এবং ২১ মে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির জন্য সরকার গণশুনানির আয়োজন করতে যাচ্ছে। তবে এবার যে কৌশলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এতে দাম বৃদ্ধির সঙ্গে চাপে পড়বেন নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা। এবার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) শুধু ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে না, এর সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ধাপভিত্তিক (স্ল্যাব) সুবিধার কাঠামোও পরিবর্তন করতে চাচ্ছে। সংস্থাটি তার আয় বৃদ্ধির জন্য এমনটি করছে। আর এমনটি হলে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়বেন সীমিত আয়ের মানুষ। এর ফলে গ্রাহকদের একটি অংশ যারা কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তারা বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা হারাতে পারেন। পিডিবির হিসাব বলছে, ধাপভিত্তিক (স্ল্যাব) সুবিধার কাঠামোর পরিবর্তনের প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার।
পিডিবির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক পরিচালন) মো. নুরুল আবছার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য আমরা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিইনি। নতুন প্রস্তাবে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ধাপ না ধরে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ধরেছি। এর মাধ্যমে বছরে পিডিবির ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা আয় হবে। সরকারি নীতির কারণে বছরে পিডিবির ৬৩ হাজার কোটি টাকা এখন লোকসান হচ্ছে। আমরা ১৩ টাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বিক্রি করছি ৭ টাকায় অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা কমে বিক্রি করছি। এতে যে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে তা কমানোর জন্যই আবাসিকের গ্রাহকদের বিলিং স্ল্যাব পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পিডিবির হিসাবে বর্তমানে দেশে আবাসিকে বিদ্যুৎ গ্রাহক ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি। এর ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফলাইন শ্রেণির। যারা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। আর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন ২২ শতাংশ গ্রাহক। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহার করেন ১ কোটি ৫৩ হাজার ৮৬২ গ্রাহক। আর বাকি চারটি ধাপ ২০০ থেকে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন ১২ শতাংশ গ্রাহক।
বিদ্যুতের স্ল্যাব কাঠামো অনুযায়ী ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এরপর ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের গ্রাহক। প্রস্তাব অনুযায়ী লাইফলাইন আর প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে না। তবে ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলেই গ্রাহকদের বাড়তি দাম দিতে হবে। বর্তমানে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা দ্বিতীয় ধাপের বিল দেন। পিডিবি এই ধাপটি বদলে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট করার প্রস্তাব দিয়েছে। এক্ষেত্রে এই ব্যবহারকারীরা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত কম দামের সুবিধা পাবেন না। পিডিবির নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ৭৬ ইউনিট পার হলেই পুরো ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের উচ্চহারে হিসাব হবে। এ হিসেবে কোনো গ্রাহক যদি ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তবে তিনি আর প্রথম ৭৫ ইউনিটের কম মূল্যের সুবিধা পাবেন না। দেশের বড় একটি অংশের বিদ্যুতের গ্রাহকরা এখন বাসায় একটি ফ্রিজ, কয়েকটি বাতি, ফ্যান, টেলিভিশনের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করেন। এতে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী ২৩ শতাংশ গ্রাহক যারা নিম্নবিত্ত শ্রেণির তাদের ওপর এই সিদ্ধান্ত বাড়তি চাপ তৈরি করবে। বর্তমান নিয়মে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী একজন গ্রাহকের প্রথম ৭৫ ইউনিটের বিল হয় প্রথম ধাপের দামে। যা প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। এতে বিল দাঁড়ায় ৩৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাকি ১২৫ ইউনিটের বিল হয় দ্বিতীয় ধাপের দামে। যা প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা। এতে যোগ হয় ৯শ টাকা। সব মিলে বর্তমানে বিল দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে একই ২০০ ইউনিটের পুরোটাই দ্বিতীয় ধাপের দামে হিসাব হবে। সেই গ্রাহকের বিল হবে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। ধাপ বদলে তার বিল বাড়বে ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। এর সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের দামও বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে পিডিবি। সংস্থাটি প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে ২০০ ইউনিট ব্যবহারীর একজন গ্রাহকের বিল হবে ১ হাজার ৬৪০ টাকা। মাসে বিল বাড়বে ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা। বিলের সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট যুক্ত হবে। ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ভিসি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত এই স্ল্যাবে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এখানে ভর্তুকি কমানোর জন্য এই উদ্যোগ। নিম্ন আয়ের লোক এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য এই স্ল্যাবের বিদ্যুতে সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এতে যারা কম ব্যবহারকারী তাদের সঙ্গে যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন তারাও ভর্তুকি পাচ্ছেন। যানবাহন, জ্বালানি ও বাসায় রান্নার জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের দামও বাড়ছে- এ কারণে অবশ্যই নিম্নআয়ের লোকদের জীবনে প্রভাব পড়বে।