কোমলমতি শিশুদের জন্য আতঙ্কের জনপদে পরিণত হচ্ছে বন্দরনগর চট্টগ্রাম। খেলার মাঠ, বিদ্যালয়, পরিচিত প্রতিবেশীর বাসা এমনকি নিজের ঘরের সুরক্ষিত সীমানায়ও বিকৃত মানসিকতার শিকার হচ্ছে শিশুরা। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক ঘটনাগুলো এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। লাগামহীনভাবে একের পর এক এমন অমানবিক ঘটনা ঘটলেও থামানো যাচ্ছে না অপরাধীদের দৌরাত্ম্য।


সিএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ‘আমরা প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। প্রতিটি ঘটনার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মামলার দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে কেবল পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি দূর করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান মৌমিতা পাল বলেন, ‘অপরাধের মাত্রা ও ধরন আমাদের সমাজের পচনশীলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। যখন একজন অপরাধী দেখে যে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করেও সহজে পার পাওয়া যায়, তখন সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’


শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং চট্টগ্রাম পুলিশের নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্কের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার শতাধিক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল শেষ ছয় মাসেই প্রায় ৮৫টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) আসা ভুক্তভোগীদের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা যৌন নির্যাতনের শিকার রোগীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই হচ্ছে শিশু। যাদের বয়স ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এর বাইরেও অসংখ্য ঘটনা সামাজিক লোকলজ্জা ও আপসের ফলে থানা বা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে দাবি মানবাধিকারকর্মীদের।


চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিশুদের প্রতি যৌন আচরণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার নেপথ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী শিশুর পূর্বপরিচিত ব্যক্তিরা জড়িত। প্রায় ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধী হচ্ছে শিশুর নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, বাসার কেয়ারটেকার কিংবা স্থানীয় দোকানি। পাশাপাশি ভাসমান ও পথশিশুদের ক্ষেত্রে স্থানীয় বখাটে, মাদকাসক্ত তরুণ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সরাসরি জড়িত। এ চক্রগুলো অসহায় শিশুদের খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দিনের পর দিন এমন পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২২ মে মহানগরের ডবলমুরিংয়ের হাজীপাড়ায় এক নিরাপত্তাকর্মী ৭ ও ১১ বছরের দুই বোনকে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে খালি প্লটে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। একই দিনে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় ৫ বছরের আরেক শিশুকে চকলেটের কথা বলে ধর্ষণের চেষ্টা চালান এক প্রতিবেশী। এর আগে ২১ মে বাকলিয়ায় ৪ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।