২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা পার্কের বটমূলে ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। এ হামলায় ঘটনাস্থলেই মারা যান নয়জন। হাসপাতালে আরও একজন। নির্মম এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা দুটি মামলার বিচার শেষ হয়নি ২৫ বছরেও। হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাই কোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানি শেষে রায়ও হয়েছে। এখন রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে আসামিদের হাজির না করায় বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলাটি এখনো নিম্ন আদালতই পার হতে পারেনি।
২০১৪ সালে হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাই কোর্টে আসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুকও (রায়সহ যাবতীয় নথিসংবলিত বই) তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালে হাই কোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে প্রথম শুনানির জন্য ওঠে। শুনানি শুরুও হয়। পরে কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আলোচিত এ মামলায় আট আসামির ডেথ রেফারন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিল হাই কোর্টের তিনটি বেঞ্চের কার্যতালিকায় উঠলেও শুনানি শেষে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। সর্বশেষ শুনানির জন্য বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় ওঠে এ ডেথ রেফারেন্স ও আপিল। পরে গত বছর ৮ মে রায় দেন হাই কোর্টের এই বেঞ্চ।
রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাত আসামির সাজা কমিয়ে দেন হাই কোর্ট। এর মধ্যে একজনের সাজা কমে যাবজ্জীবন এবং অন্যদের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির মধ্যে একজনের সাজা বহাল রেখেছেন হাই কোর্ট। বাকি পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনের সাজা কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং দুজন মারা যাওয়ায় তাদের আপিল পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে রায়ে। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুফতি হান্নানের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাঁর আপিলও পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেছেন হাই কোর্ট। রায়ের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রমনা বটমূল মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের পর হাই কোর্টের রায়ও ঘোষণা হয়েছে। তবে এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো প্রকাশ হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘রায়ের অনুলিপি না পাওয়ায় দণ্ডিত আসামিদের পক্ষে আপিল করা সম্ভব হয়নি। কপি পেলে আসামিপক্ষ থেকে আপিল করা হবে।’ ঢাকার আদালত সূত্রে জানা গেছে, হাই কোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘদিন বিস্ফোরক মামলার বিচারকাজ থমকে ছিল। ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর ২০২১ সালে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতায় ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ওই ট্রাইব্যুনালেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেশি থাকায় ২০২৩ সালের মার্চে বিস্ফোরক মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। বর্তমানে ওই আদালতে মামলার বিচার থমকে আছে। একের পর এক তারিখ পরিবর্তন করা হলেও আসামিদের আদালতে হাজির না করায় মামলাটির বিচারকাজ আটকে আছে। আগামী ৯ জুলাই মামলাটি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য আছে। জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘২০২২ সালের ৩ এপ্রিল এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি হয়। একজন আসামি এতে স্বাক্ষর না করে মহামান্য হাই কোর্টে যান। এতে বিচারকাজ আটকে যায়। বর্তমানে বিচার চলতে হাই কোর্টের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আগামী তারিখে আসামিদের আদালতে হাজির করা গেলে মামলাটি দ্রুত রায়ের দিকে নিয়ে যাব।’ এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জানান, ‘এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও মামলা বিচারাধীন। জেল কর্তৃপক্ষ সবাইকে একসঙ্গে আদালতে হাজির করতে না পারায় বিচারকাজ শেষ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রসিকিউটরের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি দ্রুত বিচারকাজ শেষ করতে পারব।’