“প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”-
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার কথা কি আমরা ভুলেই গেছি? এ দেশে এখন সবচেয়ে অরক্ষিত, অনিরাপদ হলো শিশুরা। হামে শিশুমৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গতকাল পর্যন্ত দেশে হাম ও উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শতাধিক শিশুর। যা চলতি বছর বিশ্বে হামে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।
একই সময়কালে হাম ও উপসর্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সুদানে। সেখানে মারা গেছে ৩৭১ জন। অথচ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যায় বাংলাদেশের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে ছিল সুদান। হাম ও উপসর্গে এ বছর মৃত্যুতে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে হামে অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের সীমাহীন গাফিলতির একটি উদাহরণ মাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ইউনিসেফ অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা-সংকটের কথা বলে সতর্ক করেছিল। তারা ১০টি মিটিংয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিল। ইউনিসেফ মনে করে, অন্তর্র্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি। এটি প্রমাণ করে এই শিশুদের আসলে হত্যা করা হয়েছে। যে হত্যার দায় অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার। এ ঘটনার জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি দেশবাসীর। শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সরকারের উচিত অবিলম্বে এ বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে দোষীদের চিহ্নিত করা। তাদের আইনের আওতায় আনা। এটা যদি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে। এই দায়মুক্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই দেশে শিশু নিপীড়নের ঘটনা মহামারি আকার ধারণ করেছে। একদিকে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু সব রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে অন্যদিকে একের পর এক শিশু ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনায় স্তব্ধ গোটা দেশ। তার পরও মনে হচ্ছে আমরা যেন ক্রমে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছি। আমাদের আবেগে যেন জং ধরেছে। আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলো যেন হারিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে। এতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, উঠছে প্রশ্ন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত পয়লা জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকটিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধপ্রবণতা নয়; দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দায়ী। মাদকাসক্তির বিস্তার, বিকৃত, অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা এ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় থাকে।
প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে কেন? কেন সমাজের কিছু মানুষ এত পৈশাচিক হয়ে উঠছে? বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে শান্তিপ্রিয়। এ দেশের মানুষ শিশুবান্ধব। শিশু নিপীড়ন কিংবা শিশু হত্যা আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে যারা এসব করেছে তাদের প্রতি সামাজিক ঘৃণা তৈরি হতো। কিন্তু এখন আমরা সবাই কেমন জানি অনুভূতিহীন, আবেগহীন। এসব ঘটনার পর আমরা প্রতিবাদ করতেও যেন ভয় পাই। এর কারণ আমার বিবেচনায় প্রধানত তিনটি। প্রথমত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্য এবং তৃতীয়ত মব সংস্কৃতির কারণে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা।
ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সমাজে একটি শ্রেণির উত্থান ঘটে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, যারা আইন এবং বিচারের ঊর্ধ্বে। এরা থানা লুট করে, পুলিশ হত্যা করে, বিচার হয় না। এরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, সবাই মুখ বুঝে সহ্য করে। এরা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা করে, লুটপাট করে, এদের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয় না। এরা প্রকাশ্যে নারীদের লাঞ্ছনা করে, কেউ বাধা দেয় না। এরা মাজারে হামলা করে, প্রবীণ নাগরিকদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়, সরকার এসব ঘটনাকে নীরব সমর্থন দেয়। এসব নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ইউনূস সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে সমাজে কিছু দুর্বৃত্ত অপ্রতিরোধ্য হয়ে গেছে। তারা মনে করছে, যা কিছু করি না কেন আমাদের বিচার হবে না। আজকে শিশু নিপীড়নের ভয়াবর্তার উৎস এখানেই। এই দানবরা মনে করছে, তারা যাই করবে, তাদের বিচার হবে না। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আজকে দেশজুড়ে এসব বীভৎসতার প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম-সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়া এখন বুলিং, অশ্লীলতা আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে গেছে। নারী এবং শিশুদের বিরুদ্ধে এখানে সহিংসতা এবং নোংরামির রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। জুয়া, পর্নোগ্রাফির রমরমা বাধাহীন মেলা চলে এখন সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিছু মানুষরূপী পশুর প্রধান কাজ হলো-সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীকে হেনস্তা করা, অশ্লীলতা ছড়ানো। সাইবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর সাইবার সিকিউরিটি আইন বাতিলের দাবি সামনে আসে। সেই সময় তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কোনোরকম পরিকল্পনা ছাড়াই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের ঘোষণা দেন। বাস্তবতা পর্যালোচনা না করে, অংশীজনদের মতামত না নিয়েই ২০২৫ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিল করা হয়। আসিফ নজরুল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বদলে সাইবার সিকিউরিটি আইন অধ্যাদেশ জারি করেন।
গেজেটে বলা হয়, ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা হয়েছে। তবে ওই আইনের ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২২, ২৩, ৩০, ৩২ ও ৩৫ ধারাসমূহ বলবৎ থাকবে। কিন্তু পরবর্তীতে আইনটি সংশোধন করা হয়। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩৪ বাদ পড়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ধারাগুলোয় নিষ্পন্নাধীন কোনো মামলা বা অন্যান্য কার্যধারা ও তদন্ত বাতিল হবে এবং কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এ ছাড়া এসব ধারায় আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড ও জরিমানা বাতিল হবে।
আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে (১৭ থেকে ৩০) বিভিন্ন সাইবার অপরাধ এবং তার দ চিহ্নিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ বা হ্যাকিং, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেম, ইত্যাদিতে বেআইনি প্রবেশ, কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ও সাইবার স্পেসের ভৌত অবকাঠামো ইত্যাদির ক্ষতিসাধনের অপরাধ, সাইবার স্পেসে জুয়া, জালিয়াতি, প্রতারণা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেল, অশ্লীল ভিডিও প্রকাশ, ধর্মীয় উসকানি, জাতিগত বিদ্বেষ এবং ঘৃণা ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এই আইনে ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যা অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়েছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশে কিছু পরিবর্তন এনে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। যা ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এ আইনটিও নাগরিক সুরক্ষা প্রদানে সক্ষম নয়। সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ আইনে একজন ব্যক্তিকে বিরামহীনভাবে সাইবার বুলিং করলে কোনো শাস্তি নেই। এআই দিয়ে কারও ছবির সঙ্গে অন্যের ছবি যুক্ত করে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নেই। আইনে সাইবার স্পেসে শিশু ও নারীদের সুরক্ষার কথা বলা নেই। অবারিত পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের কোনো আইন নেই। আসিফ নজরুল না জেনে না বুঝে সাধারণ মানুষকে একটি সাইবার ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষকে কিছু সাইবার অপরাধীর কাছে জিম্মি করেছেন। ইউনূস সরকারের আমলে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মব বাহিনী। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যারা এখন শিশুদের নিপীড়ন করছে, হত্যা করছে, এরা এসব মব দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় শিশু নিপীড়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মব বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হয়। ইউনূসের আমলে গড়ে ওঠা ছোটবড় সব মব গোষ্ঠীকে নির্মূল করতেই হবে।
শিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়তে হলে আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অপরাধী যেই হোক না তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। হামে শিশুমৃত্যুর জন্য যারাই দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন যারা শিশু হত্যার সঙ্গে জড়িত তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি কার্যকর করতে হবে। অতীতে যারা মব করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই পারে আমাদের শিশুদের সুরক্ষা দিতে।