ঘণ্টা-দুয়েকের মাঝারি বৃষ্টি হলেই মারাত্মক জলাবদ্ধতা তৈরি হয় রাজধানী ঢাকায়। এতে স্থবির হয়ে পড়ে যানবাহন চলাচল, থমকে যায় নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপন। সড়কে আটকে থাকে অ্যাম্বুলেন্স, অফিসগামী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পোহাতে হয় ভোগান্তি। অথচ গত এক দশকে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় হয়েছে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা। অসংখ্য প্রকল্পে টাকা ঢাললেও সমাধান মেলেনি জলজট সমস্যার।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রাজধানীর ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এরপর ২০২১ সালে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর নতুন করে ড্রেন নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পাম্পিং স্টেশন উন্নয়ন এবং বর্জ্য অপসারণে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। একই সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় ৭১১ কোটি টাকা। এ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে শত শত কিলোমিটার নতুন ড্রেন ও বক্স কালভার্ট। সব মিলিয়ে গত এক দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থা অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। অথচ দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, মগবাজার, মালিবাগ, মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁওসহ বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
কাগজে-কলমে প্রকল্পের উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও বাস্তবে প্রতি বর্ষায় একই চিত্র দেখা যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার একটি বড় উদাহরণ ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক। ২০২১ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রায় ২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ওই সড়কের নিচে নতুন একটি ড্রেনেজ পাইপলাইন নির্মাণ করে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরও ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে বৃষ্টির পানি জমার সমস্যা কমেনি। কারণ ওই এলাকায় আগে থেকেই দুটি ড্রেন ছিল। নতুন পাইপের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সাতমসজিদ সড়কের প্রধান ড্রেনে গিয়ে কাটাসুর খালে পড়ার কথা। কিন্তু প্রধান ড্রেনটি নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়া, পলি ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যে ভরে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে পূর্বের প্রকল্পগুলোর স্বাধীন মূল্যায়ন প্রয়োজন। আগে ওয়াসা এরপর সিটি করপোরেশন বিছিন্নভাবে প্রকল্প নিয়েছে। এসব প্রকল্পে কতটা কাজ হয়েছে আর কতটা তছরুপ হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো ধরনের মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, রাজউক প্রকল্প নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোতে কী পরিমাণ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ সংস্থাগুলো কোনো ধরনের মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই যে যার ইচ্ছামতো প্রকল্প নিয়েছে।
কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কতটা কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে, কোথায় পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বেড়েছে এবং কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে এসব তথ্য শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করা উচিত। খাল দখলমুক্ত রাখা, ড্রেনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলো বহু বছর ধরেই চিহ্নিত। রাজধানীর অধিকাংশ প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার দখল অথবা ভরাট হয়ে গেছে। যেসব খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে চলে যাওয়ার কথা, তার অনেকগুলোই সংকুচিত। ড্রেন নির্মাণ হলেও সেগুলোর সঙ্গে কার্যকর আউটফল বা নদী-খালের সংযোগ নেই। ফলে ড্রেনে জমা পানি শেষ পর্যন্ত বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। ড্রেনের বড় অংশ প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে আটকে থাকে। নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এক সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করছে, অন্য সংস্থা ড্রেন করছে, আবার অন্য সংস্থা পাইপলাইন বসাতে রাস্তা কেটে ফেলছে। এতে নতুন নির্মিত অবকাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। দায়িত্ব বদল হলেও বদলায়নি বাস্তবতা। ২০২০ সালের শেষে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ছয় বছর পরও রাজধানীর বহু এলাকায় একই সমস্যা রয়ে গেছে। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত বাড়ায় বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। রাজধানীর খালগুলোকে আগের অবস্থায় পুনরুদ্ধার করা গেলে এ সংকট অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি, ঢাকার পানি দ্রুত বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।