চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চলছে পুরোদমে। বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ২১ মামলায় ৪৫৭ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলমান। এসব আসামির মধ্যে ২৯৩ জনই পলাতক রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুম ও খুন এবং গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় মামলাগুলো করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে তিন মামলার রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দুই মামলায় ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লা-আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ ১১ জনকে দণ্ড দিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল-২ দণ্ড দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৫ জনকে। এ ট্রাইব্যুনাল রাজসাক্ষী হওয়া এক আসামিকে ক্ষমা করেছেন। বর্তমানে বিচার কার্যক্রম চলমান মামলাগুলোর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ ১৬টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ পাঁচটি মামলা রয়েছে।


প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছেন ৭৪ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য রয়েছেন ৬৫ জন, সেনাবাহিনীর সদস্য ২০ জন এবং আনসারের একজন সদস্য রয়েছেন।


এদিকে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মূল মামলাগুলোর পাশাপাশি তদন্তে থাকা বিবিধ মামলা (মিস কেস) ৩৪টি। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ এ ৩২টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ দুটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় ২০৭ আসামির মধ্যে ৯৬ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে এবং ১২৫ জন পলাতক রয়েছেন। জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আমরা কাজ করছি। এ প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার বিলম্ব হচ্ছে না। এখন এক সঙ্গে ২১টি মামলার বিচার চলমান রয়েছে। রায়ের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে দুটি মামলা। আরও বেশ কিছু অভিযোগ তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এখনো অনেক আসমি পলাতক, তাদের গ্রেপ্তারে কোনো উদ্যোর রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। উল্লেখযোগ্য আসামির মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, শাহজাহান খান, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ডা. দীপু মনি, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান রয়েছেন। গণ অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বেশ কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়। এসব সংশোধনীর মাধ্যমে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পাশাপাশি চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিধানও যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি গুমের বিচারের বিধানও যুক্ত হয় ট্রাইব্যুনাল আইনে। বিচার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার, ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠন বা দলের বিচারও করা যাবে সংশোধিত আইনে।


রায়ের অপেক্ষায় আরও দুই মামলা : চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুই মামলা বর্তমানে রায়ের জন্য অপেক্ষমান। মামলাগুলোর রায় যে কোনো দিন ঘোষণা হতে পারে। আলোচিত এই দুটি মামলা হলো- রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলা এবং রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলির মামলা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম জানান, দুটি মামলাই রায়ের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। এই দুই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৩৫ জন।


যে তিন মামলায় দণ্ড : ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে গত ১৭ নভেম্বর চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছর সাজা। এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির দিন রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৬ জানুয়ারি সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলার আরও পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে রায়ে। এ ছাড়া গণ অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম, সাভার থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সাইয়্যেদসহ ৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এ মামলায় সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুই আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে রায়ে। আর মামলার রাজসাক্ষী আবজালুর রহমানকে ক্ষমা করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।