দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য ও দূষণের সঙ্গে লড়াই করেছিল সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জিয়লা গ্রামের ঘোষপল্লি। বংশ পরম্পরায় গাভি পালন করলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জ্ঞান না থাকায় নোংরা পানি আর দুর্গন্ধে জর্জরিত ছিল এ জনপদ। এখন সেখানে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির উদ্যোগ ঘুরিয়ে দিচ্ছে মানুষের জীবিকা ও পরিবেশের চেহারা। উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর পরামর্শে কৃষকেরা গরু লালন-পালনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে। খামারিদের গোবর থেকে ভার্মি কম্পোস্ট, ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাতে কৃষকরা পাচ্ছে গোবর থেকে বাড়তি আয়। অন্যদিকে ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহারে বাড়ছে জমির উর্বরতা। জিয়লা গ্রামের কৃষক কবির হোসেন জানান, রাসায়নিক সার কম দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের ধান ভালো হয়েছিল। ধানের পরপরই পাট বুনেছিলেন। পাটে কোনো সার দেননি। এই জৈব সারে পাট প্রায় দেড়গুণ লম্বা, খড়ি ও পাটের আস্তরণ মোটা হয়েছে অনেক।
গোবর থেকে জৈব সোনা : জিয়লার ঘোষপাড়া থেকে প্রতিদিনই শত শত টন গোবর সংগ্রহ করছেন আশপাশের গ্রামের জৈব সার উৎপাদনকারীরা। এই গোবর থেকে তারা প্রথমে জৈব ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করেন। পরে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ট্রাইকো লিসেট উৎপাদন। এমন একজন উদ্যোক্তা শিবপুর গ্রামের মোড়ল আবদুল মালেক। তার বাড়ির সামনেই দেখা গেল দুই পাশে দুটি বড় শেডে চলছে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন। এক শেডে তিনজন নারী কেঁচো থেকে সার আলাদা করছেন। বাড়ির ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যায় পুরো বাড়িটাই যেন এক জৈব সার তৈরির কারখানা। ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে বের হওয়া নির্যাস প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে যা ক্ষতিকর পোকা দমন করে, কিন্তু উপকারী পোকার কোনো ক্ষতি করে না। আবদুল মালেক বলেন, ‘রাসায়নিক সারের চেয়ে ভার্মি কম্পোস্ট এবং ট্রাইকোলিসেট অনেক কার্যকর।’ তিনি জানান, মাসে প্রায় ১৫ হাজার টন ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন করেন। কয়েকটি কোম্পানি নিজেদের ব্র্যান্ড সংবলিত বস্তায় এখান থেকেই সার বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করে। এ ছাড়া স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি সংগ্রহ করেন। স্থানীয় নার্সারির মালিক ইমান আলী বলেন, ‘আগে শুধু রাসায়নিক সার ব্যবহার করতাম। এখান থেকে এক বস্তা জৈব সার দেওয়ার পর যেন মাটি কথা বলা শুরু করেছে।’ একসময়ে পিছিয়ে থাকা জিয়লা গ্রামের উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা রাখে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’। তাদের উদ্যোগে পিকেএসএফ কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে বুঝতে পারেন, এই গ্রামেই একটি আদর্শ প্রকল্প তৈরি সম্ভব। পিকেএসএফ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টার যৌথ উদ্যোগে গ্রামটিকে সাজানো হয় নতুন রূপে। প্রতি বাড়ির পাশে সংযুক্ত নর্দমা তৈরি করা হয়েছে। নর্দমার ময়লা পানি জমে নির্দিষ্ট হাউসে। সেখানে কয়েক স্তরের পরিশোধন শেষে প্রায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ হয়ে পানি খালে যায়। পিকেএসএফের নতুন প্রকল্প ‘সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট)’। তালা ও ডুমুরিয়ার পাশাপাশি পাশের ১৮ মাইল ও বাকা এলাকার খামারিদেরও এ উদ্যোগের আওতায় আনা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে খামারিরা দুধের ন্যায্যমূল্য, ফেলনা গোবরের দাম যেমন পাচ্ছেন। পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে নানা ব্যবসায়িক কর্মযজ্ঞ। পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফজলুল কাদের বলেন, ‘জিয়লাতে দেখলাম ঘোষরা বংশ পরম্পরায় গাভি পালনের কাজ করে। আধুনিক গো-ব্যবস্থাপনা না জানায় গ্রামটাকে মনে হলো গোবরের স্তূপ। আমরা কিছু লোককে প্রশিক্ষণ দিলাম। কীভাবে গোবর থেকে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি হয়। তাদের থাই কেঁচো সরবরাহ করলাম। খামারিরা দেখল ওদের গোবর পরিষ্কার করা তো হলোই আবার টাকাও পাওয়া গেল।’