জুলাই আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে আরও তৎপর হয়ে ওঠে মাদক কারবারিরা। রাতারাতি খোলস পাল্টে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে মাদক সাম্রাজ্যের গডফাদাররা। সুযোগের সদব্যবহার করে ভয়াবহ বিস্তার ঘটানো হয়েছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ নিত্যনতুন মাদকের। নতুন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপ্রচলিত মাদক। কেননা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা সেসব মাদক চিনতে পারছেন না।


এদিকে মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন নতুন মাদক স্পট। এমনটি সীমান্ত পথের মাদকের রুট ক্রমেই বাড়ছে। দেশের ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার ১৬২টি রুট দিয়ে দেশে দেদার প্রবেশ করছে মাদক। সরবারহ বাড়ায় দামও নাগালের মধ্যে চলে আসছে সেবনকারীদের। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে আসে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮২ লাখ। এই ভয়াবহ অবস্থা নিরসনে নবনির্বাচিত  নতুন সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।  পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে সব সংস্থা (ডিএনসি, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্ট গার্ড) ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস ইয়াবা, ৫০২ কেজি হেরোইন, ১৩০ কেজি কোকেন, প্রায় ২১ কেজি আফিম, ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৪৫ কেচি গাঁজা, ৫ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৫ বোতল ও ৪১ লিটার ফেনসিডিল, ২ লাখ ৭২ হাজার ৩২ বোতল ও ২০ হাজার ৬৯৬ লিটার বিদেশি মদ, ৩৯ হাজার ৬৫৭ ক্যান ও ১৫ হাজার ১০ বোতল বিয়ার জব্দ করা হয়। আর গত বছরের ১১ মাসে ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ৪ কোটি ৫ লাখ ৫০ হাজার ২২৪ পিস ইয়াবা। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ ছাড়া ১১ মাসে ১৫৭ কেজি হেরোইন, সাড়ে ১৪ কেজিরও বেশি কোকেন, ৮৭ হাজার ৪৬০ কেজি গাঁজা, ৩ লাখ ১২ হাজার ৫৫৫ বোতল ও ৮২ লিটার ফেনসিডিল, ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪৯ বোতল ও ১৭ হাজার ৮১৭ লিটার বিদেশি মদ, ১২ হাজার ৯১৯ ক্যান ও ১৪ হাজার ১৯০ বোতল বিয়ার জব্দ করা হয়। এদিকে সম্প্রতি সময়ে আইস, এলএসডি, ট্যাপেন্টাডল, গাঁজার কুশ ও কেটামিসনহ বিভিন্ন অপ্রচলিত মাদকের বিস্তার ঘটতে দেখা গেছে। পরিসংখ্যানই বলছে, গত ৫ বছরে শুধু ডিএনসির অভিযানে সাড়ে ২১ কেজি আইস, গত ৪ বছরে ৩০৭টি এলএসডি, ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯৯ পিস ট্যাপেন্টাডল, গত ৪ বছরে ২৩৮ কেজি গাঁজার কুশ ও গত বছর ৬ কেজি ৪৯ গ্রাম কেটামিন জব্দ করা হয়। এগুলো ছাড়াও ফেনসিডিলের বিকল্প ফেয়ারডিল, উইন কোরেক্স, ব্রনোকফ সি ও চকো প্লাসসহ কোডিনযুক্ত বিভিন্ন সিরাপ ঢুকছে দেশে। যেগুলো তৈরি হচ্ছে ভারত সীমান্তের বিভিন্ন কারখানায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের সবসময় জিরো টলারেন্স নীতি থাকে এবং সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে সে অনুযায়ী অতীতের কোনো সরকারের আমলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে খুব সহজেই অনলাইন ও অফলাইনে মাদক পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মাদক হয়ে গেছে ব্যক্তিনির্ভর পছন্দের বিষয়। কারও মন চাইলেই মাদক সেবন করছে। অথচ বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন হয় না। সুরক্ষিত সীমান্ত দিয়েই বছরের পর মাদক প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতির সঙ্গে এ মাদক নিয়ন্ত্রণ হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সত্যিকারের জিরো টলারেন্স নীতি না হলে এ চ্যালেঞ্জে সফলতা আসবে না। ডিএনসির উপ-পরিচালক (অপারেশন্স) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সবসময়ের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। ডিএনসিসহ সব সংস্থাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নব উদ্যমে কাজ করার প্রস্তুতিও আমাদের রয়েছে। যে নির্দেশনা আসবে সেগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে ডিএনসি।