দেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ পানি সংকটের দিকে। শুষ্ক মৌসুমে যতটুকু ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, বর্ষায় তার সমপরিমাণ পানি আর পূরণ হচ্ছে না। উল্টো কৃষি, শিল্প ও নগরজীবনে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার। নদনদী, খালবিল, হাওড়-বাঁওড় ভরাট ও দূষণ এবং উজানের পানির ন্যায্য হিস্সা না পাওয়ায় ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে দেশের বড় অংশের সেচ ও পানীয়জলের প্রধান ভরসা এখন ভূগর্ভস্থ পানি। এতে মাটির নিচে তৈরি হচ্ছে শূন্য গহ্বর, যা দেশের পানি নিরাপত্তাকে ফেলছে চরম ঝুঁকিতে।


এই বাস্তবতায় সরকার ইতোমধ্যে দেশের কিছু অঞ্চলকে ‘পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত ২৮ অক্টোবর গেজেটের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ১৫৩টি ইউনিয়ন ও ৭২টি মৌজাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। পরে ৩০ অক্টোবর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর কোনো নতুন শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপনেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।


শেষ হচ্ছে মাটির নিচের পানি, তৈরি হচ্ছে শূন্য গহ্বর। যতটা উত্তোলন হচ্ছে ততটা পূরণ হচ্ছে না। পানি সংকটাপন্ন ঘোষণা ১৫৩ ইউনিয়নকে। মরূকরণের পথে দেশ, বিপদের মুখে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য

সরকারি হিসাবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নকে অতি উচ্চ, ৪০টি ইউনিয়নকে উচ্চ এবং ৬৬টি ইউনিয়নকে মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়ও একাধিক মৌজা ও ইউনিয়ন অতি উচ্চ ও উচ্চ পানি সংকটাপন্ন অঞ্চলের তালিকায় রয়েছে।


বাংলাদেশ পানি আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী জলাধার ও পানি ধারক স্তরের সুরক্ষায় অনুসন্ধান ও জরিপের ভিত্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এতে জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন, খালবিল ভরাট, জলাধারের পানি নিঃশেষ করা, জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পানি সাশ্রয়ী ফসল চাষে উৎসাহ এবং অধিক পানি নির্ভর ফসল নিরুৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।


পানির এই সংকট শুধু ঘোষিত এলাকায়ই সীমাবদ্ধ নয়। কয়েক দশক ধরে দেশের অধিকাংশ নগর এলাকায়ই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ৫০ বছরে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ২৩০ ফুট নেমে গেছে। ১৯৯৬ সালে যেখানে পানির স্তর ছিল ২৫ মিটারে, সেখানে ২০২৪ সালে তা নেমে যায় ৮৬ মিটারে। অর্থাৎ পানির নাগাল পেতে এখন প্রায় ২৮০ ফুট নিচে পাইপ বসাতে হচ্ছে। প্রতি বছরই ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার করে নামছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর অঞ্চলে ২০০০ সালের দিকে ৭০ থেকে ৮০ ফুট খনন করেই পানির স্তর পাওয়া যেত। এখন ৪০০ ফুট বা তার অধিক গভীরে যেতে হয় পানির নাগাল পেতে।


পরিকল্পনাবিদদের মতে, নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে জলাভূমি ধ্বংস হওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটির নিচে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে না। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২৮ বছরে ঢাকায় ৮৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। একই সময়ে নির্মাণ এলাকা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। পরিবেশবিদরা বলছেন, নদনদী-খালবিল দখল ও ভরাট হওয়ায় নগরের বাইরেও কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোয় পানিসংকট বাড়ছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর মাধ্যমে উজানের পানির ন্যায্য হিস্সা না পাওয়াও এ পানিসংকটকে বাড়িয়েছে।


বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু কৃষি নয়, বন ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। গাছপালা শুকিয়ে মারা যাবে। সুপেয় পানির সংকটে পড়বে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী। তখন পানির জন্য হাহাকার শুধু কোনো এলাকার নয়, পুরো দেশের বাস্তবতায় পরিণত হবে। পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।