১৪ বছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে সবচেয়ে কম বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে চলতি অর্থবছরে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়িক পরিবেশের সংকট এবং নীতিগত অস্থিতিশীলতার ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহ হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত ১৪ বছরে জিডিপির অনুপাতে এত কম বিনিয়োগ হয়নি। ২০১২–১৩ অর্থবছরের পরে জিডিপি–বিনিয়োগ অনুপাত এত কমেনি।
জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অংশ কমে যাওয়া বেশ উদ্বেগজনক বলে জানান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। বিষয়টিকে তিনভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। ১. কয়েক দশক ধরে বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত। এই পরীক্ষিত চালিকা শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে রপ্তানি বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছে। ২. ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির জন্য আরও বেশি কার্যকর কর্মসংস্থান (শোভন কর্মসংস্থান) দরকার। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থাকায় সেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ৩. বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত দরকার। এ জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। ৪. এখন বন্দর, জ্বালানির মতো বড় অবকাঠামো সরকার করে না। এসব অবকাঠামো তৈরি করেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা।
এসব কারণে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ জিডিপির অনুপাত কমে যাওয়া উদ্বেগজনক মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ হলো একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ কত, তার শতকরা হার। সরকারি–বেসরকারি বিনিয়োগ মিলিয়েই বিনিয়োগের হিসাব করা হয়। সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) বিভিন্ন খাতে যে খরচ করে, তা সরকারি বিনিয়োগ।
মনে রাখতে হবে, প্রতিবছর চলতি মূল্যে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়তে পারে। কিন্তু জিডিপির কত অংশের সমান বিনিয়োগের পরিমাণ (জিডিপি–বিনিয়োগ অনুপাত), তা দিয়ে অর্থনীতির সক্ষমতা বোঝানো হয়। কারণ, বিনিয়োগ করে কতটা সক্ষমতার সঙ্গে উৎপাদনে কাজে লাগছে, তা দেখা হয়। কারণ, বিনিয়োগের মাধ্যমেই পণ্য উৎপাদন ও সেবার সৃষ্টি হয়।
জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগ কত, তা নিয়ে একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সক্ষম, তা বোঝায়। যেমন—
১. একটি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
২. নতুন শিল্প, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বোঝায়।
৩. ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তার ধারণা দেয়।
৪. দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ মূল্যায়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সাধারণভাবে, উচ্চ বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক বলে ধরা হয়। তবে বিনিয়োগের গুণগত মান, উৎপাদনশীলতা এবং বিনিয়োগ কোন খাতে হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বিগত ১৪ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিবিএসের ওয়েবসাইটে ২০১২–১৩ অর্থবছর থেকে জিডিপির হিসাব দেওয়া আছে। ২০১২–১৩ অর্থবছরের জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত ছিল ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এরপরে তা বেড়েছে।
২০১৮–১৯ অর্থবছরের জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ শতাংশে পৌঁছায়। যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এরপর কোভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা, ক্ষমতার পটপরিবর্তনসহ নানা কারণে জিডিপি–বিনিয়োগ অনুপাত কমতে থাকে। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের তা ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে আসে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিনিয়োগ নিয়ে বড় অগ্রগতি ছিল না।
পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় ঘটা করে বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়। সম্মেলনে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা দেখানো হলেও ওই দেড় বছরে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
একদিকে গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ করের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ই দেশি–বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ঋণের সুদের হারও বেশি। এসব কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার অর্থনীতি বিশেষ করে বিনিয়োগ চাঙা করতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে নানা ধরনের শুল্ক–করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বিশেষ বরাদ্দসহ শুল্ক–করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা—আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।