সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ্যে সীমান্ত দিয়ে আনা নিবন্ধনহীন অবৈধ পিস্তল বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পেজে আগ্নেয়াস্ত্রের ছবি, ভিডিও, ব্যবহারবিধি এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্রেতা খোঁজা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ নজরদারিতে এমন অসংখ্য পেজ ও বিজ্ঞাপন সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘অবৈধ পিস্তল বিক্রি বড় ধরনের অপরাধ। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বিজ্ঞাপন দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রিতে ‘যশোর বেনাপোল পিস্তল হাউস’, ‘পাকিস্তানি বর্ডার ক্রসিং পিস্তল হাউজ’, ‘বিসমিল্লাহ পিস্তল ঘর’ এবং ইংরেজিতে ‘মুন স্টার আর্মস ইন্ডাস্ট্রি’ নামে কয়েকটি পেজ বিশেষভাবে সক্রিয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যোগাযোগের জন্য পেজগুলো ০১৭০১৬৮৭৬০৮, ০১৯৫৪১১৮১৯২, ০১৩৪৭৩৯৫৯৯২ ও ০১৯৭২৭৭৬৭১৪ হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করছে। ক্রেতা হিসেবে যোগাযোগ করলে অগ্রিম টাকা পাঠানোর জন্য ‘যশোর বেনাপোল পিস্তল হাউস’ বিকাশ পার্সোনাল নম্বর (০১৬৩৬২১১৩৯২), ‘পাকিস্তানি বর্ডার ক্রসিং পিস্তল হাউজ’ বিকাশ ও নগদ পার্সোনাল নম্বর (০১৮০৬১৯২১৩২) ও ‘বিসমিল্লাহ পিস্তল ঘর’ বিকাশ ও নগদ পার্সোনাল নম্বর (০১৮৮০৭১৭৩১২) সরবরাহ করে।
এসব পেজে দাবি করা হচ্ছে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা নিবন্ধনবিহীন পিস্তল বিশেষ ছাড়ে বিক্রি করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের বর্ণনা, ওজন, ম্যাগাজিন ও গুলির সংখ্যা উল্লেখ করা হচ্ছে। এমনকি ভিডিও কলে ফায়ারিং করে অস্ত্রের কার্যকারিতা দেখানোর কথাও বলা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ব্রেটা ৯২এফএস নাইন এমএম পিস্তলসহ বেশ কয়েক ধরনের বিদেশি পিস্তল দেখানো হচ্ছে। অস্ত্র কেনার আগে ক্রেতাদের কাছ থেকে নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য নেওয়া হচ্ছে। পরে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কিছু অর্থ অগ্রিম পাঠাতে বলা হচ্ছে।
ক্রেতা সেজে এসব পেজে দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, অস্ত্রগুলো চাল, ডাল বা অন্যান্য পণ্যের বস্তার মধ্যে লুকিয়ে সরবরাহ করা হবে। কিছু বিজ্ঞাপনে বিদেশে তৈরি বিভিন্ন মডেলের পিস্তলের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ম্যাগাজিন, বুলেট ও সাইলেন্সার সরবরাহের কথাও উল্লেখ রয়েছে। পেজভেদে ৫০ শতাংশ ছাড়ে এসব পিস্তলের দাম চাওয়া হচ্ছে ৩৩ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সঙ্গে ১০ থেকে ২০ রাউন্ড বুলেট, দুটি ম্যাগাজিন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ৮ থেকে ১২ হাজার টাকায় সাইলেন্সার বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত বুলেটের দাম পেজভেদে ৭৫০ থেকে ১১৫০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তবে একাধিক পেজে দেওয়া ভয়েস মেসেজে একই ব্যক্তির কণ্ঠ বলে মনে হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনেক পেজ প্রতারণার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতে পারে। অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে বিষয়টি শুধু প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, অবৈধ অস্ত্রের বিজ্ঞাপন প্রকাশ্যে প্রচারিত হওয়া নিজেই একটি গুরুতর আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক উদ্বেগের বিষয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের ব্যবহার, ফায়ারিং এবং অপরাধমূলক উপকরণের প্রচারণা তরুণদের মধ্যে সহিংসতা ও অপরাধ প্রবণতার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এসব কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও অপসারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।