রাজধানীর কারওয়ান বাজারে চাল কিনতে গিয়েছিলেন রিকশাচালক নাসির উদ্দিন। জিনিসপত্রের দাম কমার কথা শুনে বাজারে এসে তিনি তার উল্টো চিত্রই দেখেন। তিনি বলেন, ‘দাম নাকি কমছে- এ কথা অনেক দিন ধরে শুনছি। কিন্তু বাজারে এলে বুঝি, সবই আগের মতো।’ আসলে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির ওঠানামা থাকলেও বাজারের বাস্তবতা বদলায়নি। সিপিডির বাজার জরিপে দেখা যায়, চাল, ডাল, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও বাজার তদারকির সীমাবদ্ধতা। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান। অনেক ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারে দাম স্থিতিশীল বা সামান্য কমলেও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ে না। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা এবং কার্যকর নজরদারির অভাব আবারও সামনে এসেছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নেওয়া নীতিগুলো বাজারে প্রত্যাশিত স্বস্তি আনতে পারছে না। সরকার বিভিন্ন সময় বাজারে হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি বা কাঠামোগত সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নির্বাচনের বছরে দাঁড়িয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়েই ঘোরাফেরা করছে। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগের মাস নভেম্বরেও তা ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি কখনো সামান্য কমেছে, কখনো বেড়েছে, তবে সার্বিকভাবে এটি ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে ছিল।


তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, টানা তিন মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। কার্যত গত তিন বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত সূচক নয়। এটি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর বাজার তদারকি নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে না। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকারের নীতিগত উদ্যোগগুলোকে কেবল স্বল্পমেয়াদি বাজার হস্তক্ষেপে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সরবরাহ চেইনে কাঠামোগত সংস্কার এবং দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।


বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির প্রতিবেদন বলেছে, সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা ও খোলা বাজার বিক্রি কার্যক্রম বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সরকারি মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে না, যাতে বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়।


সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, সার উৎপাদনে গ্যাস সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের প্রভাব এবং ডলার বিনিময় হারের চাপ-সব মিলিয়ে খাদ্যদামের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগাম তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের ঘাটতিও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।