সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদারের বরাত দিয়ে একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে বলা হয়, আসন্ন নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। পরে ফ্যাক্ট চেকাররা ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখেন, পুরোনো ভিডিওকে সামনে এনে নতুন করে সংবাদ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শুধু এ ঘটনাই নয়, নির্বাচন কেন্দ্র করে সাইবার মাধ্যমে প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও। যা অনেকে বিশ্বাস করছেন।


আবার গুজবের ভিড়ে অনেকে সত্য ভিডিওকেও অবিশ্বাস করছেন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও সাইবার মাধ্যমে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে শুরু থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে র‌্যাপিড একশন নেওয়া। কেননা সমাজমাধ্যমগুলো বিশেষ করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক, ইমো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তি না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে না বাংলাদেশের সাইবার পুলিশ।


সূত্র জানিয়েছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মাধ্যমে তৈরি ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও বা যেকোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে- সেটি কোনোভাবে শনাক্ত হলেও ব্যবস্থা নেওয়াটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। যতক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়া হয় ততক্ষণে যে উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে- সেই উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের বাইরে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন গুজব ছড়াতে মরিয়া। এ ছাড়াও নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সাইবার বুলিং, এআই দিয়ে বানানো ডিপফেক ও চিপফেক ভিডিও, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অপপ্রচারের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, গুজবকারীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং অফিসার ও প্রিসাইডিং অফিসাররাও।


ডিএমপির সিটিটিসির সাইবার ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার আসনগুলো থেকে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সাইবার মাধ্যমে গুজবের শিকার হতে পারেন এমন প্রার্থীদের তালিকা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও অনেকে সমাজমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। বিভিন্ন নামে বেনামে খোলা গ্রুপ ও পেজ থেকেও গুজব ছড়ানো হয়। এ ধরনের শতাধিক পেজ ও গ্রুপ সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এক বছরে রাজনীতি বিষয়ে ২ হাজার ২৮১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা অন্য সব ক্যাটাগরি থেকে বেশি। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে রাজনৈতিক ইস্যুই ছিল গত বছর ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান ক্ষেত্র। ক্যাটাগরি হিসেবে একক মাসে ভুল তথ্য বেশি শনাক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই (ডিসেম্বরে ৪৪৬টি)।


পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর এআই-ডিপফেকের ব্যবহার বেড়েছে ৪০৯ শতাংশ। আর নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অপতথ্যের প্রবাহ। গত বছরের অক্টোবর থেকে রাজনৈতিক অপতথ্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে দেখা গেছে।


সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএএফ) উপদেষ্টা সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচন কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ভুয়া ছবি, অডিও, প্লাকার্ড ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষিত ও সচেতন মানুষও এগুলো শেয়ার করছেন এবং কমেন্ট করছেন। সচেতন মানুষদেরই এ অবস্থা হলে, সামগ্রিক পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে সেটি সহজেই অনুমেয়।


তিনি আরও বলেন, ভয়াবহতা বিবেচনা করে সরকার জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) গঠন করেছে। তবে এই উদ্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট নয়। ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সাইবার মাধ্যমে যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে আমরা তৎপর রয়েছি। ২৪ ঘণ্টাই সাইবার প্যাট্রলিং অব্যাহত রয়েছে। এখনো আমরা নির্বাচন কেন্দ্রিক অপতৎপরতার কোনো অভিযোগ পাইনি।


কেউ সাইবার মাধ্যমে হয়রানির শিকার হলে সাইবার পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।