ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সাথে দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি লাল সবুজের পতাকা। আমাদের পবিত্র মাটি, আমাদের মাতৃভূমি।


বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ অংকুরিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল সালাম, রফিক, জব্বার। বাংলা ভাষার স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল যে লোকটি, যে মানুষটি বাঙালি জাতির প্রতি সারাজীবন দেখিয়েছে চরম অবজ্ঞা এবং অবহেলা, তার নাম জিন্নাহ। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিপক্ষ হলো মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। যে লোকটির ভন্ডামী এবং বাঙালি বিদ্বেষের কারণে বাঙালি জাতির উপর নেমে এসেছিল জুলুম আর নির্যাতন। যে লোকটি বাঙালি জাতিকে ঘৃণা করতো, এখন বাংলাদেশে তাকে নিয়েই মাতামাতি করতে চায় কিছু মানুষ। সত্যি সেলুকাস!


বাংলাদেশে জিন্নাহকে নিয়ে যারা মাতামাতি করতে চায়, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী আদর্শের ধারক। এই রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসীরা এখনও ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা আন্দোলনকে অস্বীকার করতে চায়। এরা বাংলাদেশকে নতুন পাকিস্তান বানাতে চায়।


২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর বাংলাদেশে এই গোষ্ঠী খুব সচেতনভাবে পাকিস্তান প্রীতি দেখাচ্ছে। এরা বাংলাদেশের জনগণকে একাত্তরের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে তৎপর। এজন্যই এরা ২৪ এর পাঁচ আগস্টকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করে, এমনকি কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও ২৪’কে বড় করে দেখাতে চায়। এই গোষ্ঠী পাঁচ আগস্টের পর পরিকল্পিত ভাবে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সব স্মারক স্থাপনা ধ্বংস করেছে। একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছে। এই গোষ্ঠীই মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে উল্লাস করে। এরা অত্যন্ত সচেতনভাবে ভারত বিরোধিতা নামে বাংলাদেশে পাকিস্তানকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। পাকিস্তানি পোশাক, পাকিস্তানি গান এবং পাকিস্তানি সংস্কৃতির আমদানি করে এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে গত দুই বছর ধরে। একটু গভীরে গেলেই দেখা যাবে যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে গণহত্যা, লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিল, যারা একাত্তরের অপরাধের জন্য আজ পর্যন্ত ক্ষমা চায়নি, তাদের অনুসারীরাই পরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশে পাকিস্তানকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। এই পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের সর্বশেষ ঘটনা হলো ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি।


মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে বাংলাদেশে হঠাৎ যে আবেগঘন স্মরণ-অনুষ্ঠান, ছবি টাঙানো বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটা কেবল আবেগের প্রশ্ন নয়। ইতিহাসের দলিল ঘাঁটলেই দেখা যায়, জিন্নাহর ‘পাকিস্তান’ আসলে শুরু থেকেই একটা স্পষ্ট, সৎ রাষ্ট্র-পরিকল্পনা ছিল না; এটা ছিল রাজনৈতিক দর-কষাকষির একটা কৌশল, যেটা শেষ পর্যন্ত এমন একটা বাস্তবতায় রূপ নেয় যার বলি হতে হয়েছিল বাঙালিকে।


১৯৪৮ সালের ২১ ও ২৪ মার্চ ঢাকায় এসে জিন্নাহ যা করলেন, তাতে বাঙালির প্রতি তার ‘বৃহত্তর পাকিস্তান’-এর আসল চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায়। রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু তখনকার পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে পড়েও তিনি অবস্থান বদলাননি। এই একটা সিদ্ধান্তই বলে দেয়, ‘যুক্ত পাকিস্তান’ আসলে সব অঞ্চলের সমান অংশীদারিত্বের স্বপ্ন ছিল না। এটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান-কেন্দ্রিক আধিপত্যের একটা পরিকল্পনা, যেখানে বাঙালিকে নিজের ভাষা ছাড়তে বলা হচ্ছিল রাষ্ট্র গঠনের নামে।


জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনী পড়লে দেখা যায়, তার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর দিল্লি-লাহোরের রাজনীতি। পূর্ব বাংলা তার কাছে ছিল ভোটব্যাংক আর জনসংখ্যাগত শক্তির একটা উৎস, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতি নিয়ে আলাদা মনোযোগ পাওয়ার মতো অঞ্চল নয়। ফলাফল হিসাবে দেখা গেল স্বাধীনতার পরপরই পূর্ব বাংলা পরিণত হলো পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে, যেখান থেকে সম্পদ পাচার হতো, অথচ রাজনৈতিক ক্ষমতা আর সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। এই বৈষম্যের বীজ বোনা হয়েছিল জিন্নাহর জীবদ্দশাতেই।


জিন্নাহর ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান’-এর ধারণা আসলে কতটা ভঙ্গুর ছিল, তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ১৯৭১ সালে, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই গণহত্যা চালায়।


সম্প্রতি বাংলাদেশে কিছু মহল থেকে জিন্নাহকে নিয়ে যে আবেগ দেখা যাচ্ছে-তার মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানানো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় তার ছবি নতুন করে জায়গা পাওয়া-এসব নিছক ইতিহাসচর্চা নয়। যারা এখনও অখণ্ড ‘একটি পাকিস্তান’ ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, তাদের কাছে জিন্নাহ একটা বিকল্প জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, যে পরিচয় বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে ছিল। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এসে যে রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্বই অর্জন করেছে জিন্নাহর কল্পিত রাষ্ট্রকাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, সেখানে তাকে নায়কের আসনে বসানো মানে একাত্তরের শহীদদের আত্মত্যাগকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিতে জায়গা পাওয়ার কথা ভাষা শহীদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের, জিন্নাহর নয়। কারণ তার স্বপ্ন ছিল আমাদের স্বপ্নের বিপরীত মেরুতে।


বাংলাদেশে নতুন করে যারা জিন্নাহ আর পাকিস্তানকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন তারা আসলে এদেশকে নতুন পাকিস্তান বানাতে চায়।  ২৪ এর পর বাংলাদেশে একটা গোষ্ঠীর মধ্যে পাকিস্তানের ভুত সাওয়ার হয়েছে। এই গোষ্ঠীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেন ড. ইউনূস।


২৪ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বের একটি দেশের সাথেই শুধু সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পেরেছে, সেটা হলো পাকিস্তান। এই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে বাড়তে থাকা সম্পর্ক। বিশেষ করে সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগ জোরদার হওয়ায় বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মালিকের ঢাকা সফর এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো আইএসআই প্রধান বাংলাদেশ সফর করলেন। ২০২৪ সালের পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক যোগাযোগও বেড়েছে।এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানের প্রচণ্ড আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।


বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তানের আগ্রহের কারণ দু’টি।


প্রথমত, ১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আর কখনোই পাকিস্তান হবে না। কিন্তু বাংলাদেশে যদি পাকিস্তানপন্থীদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয় তাহলে পাকিস্তানের অভিপ্রায় অনুযায়ী বাংলাদেশ চলবে। ৭১ এ পরাজিত দেশটি আর যাই হোক বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সহ্য করতে পারে না।


দ্বিতীয়ত, ভারতকে অস্থিতিশীল করার জন্য বাংলাদেশের ভুখণ্ড ব‍্যব্যবহার করা। এদেশে যত ভারত বিরোধিতা বাড়বে ততই ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশকে ব‍্যবহার করে পাকিস্তান ভারতকে বিপদে ফেলতে চায়। ২৪ এর পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি মহলের প্রকাশ্য পাকিস্তান প্রেম আর জিন্নাকে নিয়ে চর্চা একই সূত্রে গাঁথা।


কিন্তু এদেশের মানুষ সচেতন। তারা বাংলাদেশকে নতুন পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে। শিক্ষার্থীরা ডাকসুর সংগ্রহ শালা থেকে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী। প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নও। একই ভাবে বাংলাদেশকে নতুন পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্রও রুখে দেবে এদেশের জনগণ। বাংলাদেশ কখনও পাকিস্তান হবে না।