রাজধানীর সড়কে যানজটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল চলাচল। একই রুটে একাধিক কোম্পানি ও মালিকের বাস প্রতিযোগিতা করে চলায় অনেক সময় নির্ধারিত লেনের তোয়াক্কা করা হয় না। যাত্রী পাওয়ার আশায় একটি বাস আরেকটিকে ওভারটেক করতে গিয়ে হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছে। আবার নির্ধারিত বাসস্টপেজের পরিবর্তে সড়কের মাঝখানেই থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাস। এতে পেছনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট, ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন পথচারী ও অন্য যানবাহনের চালকরা।


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘গণপরিবহনে আধুনিকায়ন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত উন্নয়নে নজর দিতে হবে। প্রথমে অগ্রাধিকার দিতে হবে পথচারীদের এরপর গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে অনুৎসাহিত করতে গণপরিবহনকে যুগোপযোগী করতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন ৪০টি নতুন গাড়ি নামছে রাস্তায়। রাস্তা না বাড়লেও গাড়ি বাড়ছে প্রতিদিন। এতে যানজট বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় গাড়ি মাত্র ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার যেতে পারছে। রাস্তা না বাড়িয়ে ডবল ডেকার বাসে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যেতে পারে। সড়ক পরিবহনে বিজ্ঞান ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থাকে এক ছাতার নিচে কেউ কখনো আনতে পারেনি।’


রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সরেজমিন দেখা যায়, বাসগুলো কখনো ডান পাশের লেনে, কখনো বাম পাশের লেনে ঢুকে পড়ছে। যাত্রী দেখলেই গতি কমিয়ে কিংবা হঠাৎ ব্রেক করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। পেছনে থাকা গাড়িগুলোকে তখন আকস্মিকভাবে গতি কমাতে হচ্ছে অথবা পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে। ব্যস্ত সড়কে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত লেন পরিবর্তন সামান্য ভুলেই তৈরি করছে সংঘর্ষের পরিস্থিতি।


বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অফিস পাড়ার সামনে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানোনামানোর প্রবণতা বেশি। একটি বাস থামলে তার পাশ দিয়ে আরেকটি বাস যাওয়ার চেষ্টা করে। একই সময়ে পেছন থেকে আসা ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার কারণে সড়কের স্বাভাবিক গতি ভেঙে পড়ে।


রাজধানীর বাস চলাচলের বড় সমস্যা নির্ধারিত বাসস্টপেজের ব্যবহার না করা। যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্ধারিত স্থান থাকলেও অনেক বাসচালক ও সহকারী তা মানছেন না। যাত্রী ডাকতে গিয়ে রাস্তার মাঝপথে বাস থামানোর ঘটনাও নিয়মিত।


রাজধানীর গণপরিবহনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো যাত্রী পাওয়ার প্রতিযোগিতা। একই রুটে একাধিক বাস কোম্পানি থাকায় যাত্রী তোলাকে কেন্দ্র করে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে নির্দিষ্ট গতিসীমা, লেন কিংবা নিরাপদ দূরত্বের পরিবর্তে কে আগে যাত্রী নিতে পারবে-সেটিই অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


একই রুটে একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিযোগিতামূলক চলাচলকে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যাত্রী যত বেশি, আয় তত বেশি-এমন কাঠামোর কারণে বাসকর্মীদের মধ্যে যাত্রী সংগ্রহের চাপ থাকে।


রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, গত বছর ঢাকা শহরে ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত ও ৫১১ জন আহত হন। এসব দুর্ঘটনার ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশে বাস জড়িত ছিল। সংস্থাটি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, যানবাহনের তুলনায় সড়কের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা, একই সড়কে বিভিন্ন গতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত দখল, সড়কের চিহ্ন ও সংকেতের ঘাটতি এবং দুর্বল সড়কব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছে। রাজধানীতে দুর্ঘটনার বড় হটস্পট হিসেবে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর সড়কের নামও এসেছে। 


বাসের যত্রতত্র থামার প্রভাব শুধু ওই বাসের পেছনে থাকা কয়েকটি গাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যস্ত সড়কে একটি বড় বাস হঠাৎ থামলে তার পেছনের গাড়িগুলোকে ব্রেক করতে হয়। পাশের লেনের যানবাহনও তখন গতি কমায়। এভাবে একাধিক বাস একই স্থানে থামলে যানজট আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, গুলিস্তান, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, মিরপুর, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরের মতো ব্যস্ত এলাকায় এর প্রভাব বেশি দৃশ্যমান। যত্রতত্র বাস থামানোর আরেকটি বড় ক্ষতি হচ্ছে যাত্রীদের নিরাপত্তা।  নির্ধারিত বাসস্টপেজ না থাকলে কিংবা বাস সেখানে না থামলে যাত্রীদের চলন্ত যানবাহনের মধ্য দিয়ে বাসে উঠতে হয়। অনেক সময় বাসে ওঠার জন্য যাত্রী রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন।