দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। একসময় যাকে বলা হতো দেশের ভোগ্যপণ্যের হৃৎপিণ্ড। ভোগ্যপণ্যের দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে সারা দেশের সরবরাহব্যবস্থা একসময় নিয়ন্ত্রিত হতো এ বাজার থেকে। এখন যা সোনালি অতীত। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজারটির সূর্য ধীরে ধীরে অস্তমিত হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো জৌলুস।


দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ বাজার খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, ‘এক সময় দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ হতো খাতুনগঞ্জ থেকে। বর্তমানে তা এক-পঞ্চমাংশে নেমে এসেছে। খাতুনগঞ্জ থেকে ব্যবসা সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন আমদানিকারক তৈরি হওয়া। যারা বিদেশ থেকে সরাসরি ভোগ্যপণ্য আমদানি করছেন। এতে খাতুনগঞ্জনির্ভরতা কমেছে। এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে খাতুনগঞ্জের জৌলুস হারানোর পেছনে।’


এক দশক আগেও ঐতিহ্যবাহী এ বাজারের ছিল ভরা যৌবন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রাক ও ঠেলাগাড়ির যানজট, শ্রমিকদের হাঁকডাক আর ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততায় সরগরম থাকত পুরো এলাকা। প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হতো। দেশের আনাচেকানাচে থেকে পাইকাররা আসতেন চাল, ডাল, তেল, চিনি, পিঁয়াজ, রসুন, আদা আর মসলাপাতি কিনতে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ইশারায় দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার ওঠানামা করত। ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ব্যবসার রমরমা যুগে একেকজন আড়তদার ছিলেন বাজারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কেবল ‘স্লিপ’ বা চিরকুটের মাধ্যমেই শত কোটি টাকার হাতবদল হতো। বর্তমান চিত্র একেবারেই ভিন্ন। নেই আগের সেই হাঁকডাক। নেই ট্রাকের দীর্ঘ সারি। অনেক আড়ত ও গুদাম দিনেও অলস পড়ে থাকে। ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে স্পষ্ট হতাশার ছাপ। বেচাকেনা নেমে এসেছে আগের তুলনায় অর্ধেকেরও নিচে। অনেক পুরোনো ব্যবসায়ী লোকসানের ভারে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে খাতুনগঞ্জের জৌলুস হারানোর নেপথ্যের একাধিক কারণ উঠে এসেছে। খাতুনগঞ্জের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভোগ্যপণ্যের বাজারে আমদানির একচেটিয়া আধিপত্য হারানো। এখন আমদানিকারকরা সরাসরি বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে নিজেদের মিল-কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করছেন এবং ডিলারদের মাধ্যমে সারা দেশে পৌঁছে দিচ্ছেন। ফলে পাইকারি বাজার হিসেবে খাতুনগঞ্জের মধ্যস্বত্বভোগী ভূমিকাটি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে কতিপয় ব্যক্তি ব্যাংক ও বাজারের টাকা মেরে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় সেই আস্থার জায়গাটি পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ব্যাংকগুলোও এখন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র পুঁজিসংকট।  ডিজিটাল যুগের প্রসার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা সরাসরি বন্দর বা মিলগেট থেকে পণ্য কিনে নিচ্ছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সম্প্রসারণের ফলে পণ্য পরিবহনে খাতুনগঞ্জ হয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আর নেই। জোয়ারের পানি ও বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা খাতুনগঞ্জের জন্য এক স্থায়ী অভিশাপ। বর্ষা মৌসুমে একটু বৃষ্টি হলেই গুদামে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়। চাক্তাই খালের নাব্যহীনতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। প্রতি বছর লোকসান গুনতে গুনতে অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে গেছেন।