রাজধানীসহ দেশের কোথাও না কোথাও মাঝে মধ্যেই ঘটছে অগ্নিকাণ্ড। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগুনের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয় ছাপিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। আর এই শর্টসার্কিটের পেছনে সবচেয়ে বড় দায় নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ক্যাবল এবং ত্রুটিপূর্ণ সার্কিট ব্রেকারের। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, দেশে প্রতিবছর গড়ে ২১ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যার প্রায় ৪০ শতাংশই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটজনিত। শুধু ২০২১ সালেই ২১ হাজার ৬০১টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, আর ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৪ হাজার। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ, আহত হয়েছেন কয়েক শ। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৩৫ শতাংশের বেশি ঘটেছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও আবাসিক ভবনে মানহীন ও নকল বৈদ্যুতিক ক্যাবল ব্যবহারই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেন, ভোল্টেজের সামান্য তারতম্যেই মানহীন বৈদ্যুতিক তার অতিরিক্ত গরম হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করে। শুধু তার নয়, বাজারে নকল ও নিম্নমানের সার্কিট ব্রেকারও ব্যাপকভাবে পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবন নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রেই বিল্ডিং কোড মানা হলেও বৈদ্যুতিক ডিজাইন ও উপকরণের মান যাচাইয়ের কোনো কার্যকর তদারকি নেই। অথরাইজড ইলেকট্রি
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স শাখার সাবেক পরিচালক মেজর শাকিল নেওয়াজ ফায়ার সার্ভিসের স্থায়ী বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সেমিনারে বলেন, দেশে মানসম্মত বৈদ্যুতিক ক্যাবল পাওয়া কঠিন। বাজারে সহজেই নকল ক্যাবল ও সার্কিট ব্রেকার মিলছে। এসব নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বনানীর এফআর টাওয়ার, চকবাজারের চুড়িহাট্টা, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডিএনসিসি মার্কেট, খিলগাঁও কাঁচাবাজারসহ একাধিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে উঠে এসেছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের তথ্য। সর্বশেষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ডও বৈদ্যুতিক আর্কিং ও শর্টসার্কিটের ফল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। যদিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকার সম্পদ, তবুও প্রাণহানি ও সামাজিক ক্ষতি অপূরণীয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ক্যাবল উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে কঠোর অভিযান, বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ, ভবনের বৈদ্যুতিক নকশা অনুমোদনে কড়াকড়ি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে অগ্নিকাণ্ডের এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি মিলবে না।
প্রশ্ন একটাই আর কত প্রাণ গেলে নকল ক্যাবলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এ বিষয়ে আকিজ বশির ক্যাবলসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে, ৩ লেয়ার ইন্সুলেটেড, ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহনশীল এবং পিওর কপার দিয়ে তৈরি উন্নতমানের ক্যাবল ব্যবহার করা উচিত।