চাঁদাবাজি আর ছিনতাইয়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে রাজধানীর আদাবর। এই এলাকার শ্যামলী লিংক রোড থেকে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত অন্তত ২০টি গার্মেন্ট এবং অ্যামব্রয়ডারি ফ্যাক্টরি রয়েছে। মাস শেষে বেতনের দিন আতঙ্কে থাকতে হয় এসব কারখানার শ্রমিকদের। কারখানার বেতনের দিনই রাস্তায় ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। শুধু শ্রমিকরাই নয়, সাধারণ পথচারীদেরও চাপাতির ভয়ে থাকতে হয়। এখানে চাপাতির ভয় দেখিয়ে ছিনতাই-চাঁদাবাজি নিত্যদিনের ঘটনা।


শনিবার রাতে আবির অ্যামব্রয়ডারি ফ্যাক্টরিতে ঢুকে এক কর্মীকে কুপিয়ে আহত করেছে চাঁদাবাজরা। এ ঘটনায় ক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসেন ব্যবসায়ীরা। পরে আদাবর থানায় মামলা করেন ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী। জানতে চাইলে গতকাল আদাবর থানার সামনে রিপন নামে এক গার্মেন্ট কর্মী বলেন, ওই এলাকার গার্মেন্ট এবং অ্যামব্রয়ডারি ফ্যাক্টরিতে মাসের ৮ থেকে ১০ তারিখ বেতন হয়। এই বেতনের টাকা নিয়ে ফ্যাক্টরি থেকে বের হলে রাস্তায় নারীদের বেশি টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। চাপাতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে বেতনের টাকাসহ সব নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সদস্য জানান, এই চাঁদাবাজদের ধরতে বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যারা তাদের চিনেন তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সময় পুলিশের সঙ্গে কেউই থাকে না এবং সহযোগিতা করে না। সুমন নামে আরেক শ্রমিক বলেন, পুলিশের পোশাক আছে, তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনী। তারা অভিযানে গেলে চাঁদাবাজরা তাদের কিছু বলার সাহস পায় না। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের দেখলে চিহ্নিত করে রাখে। পুলিশ চলে যাওয়ার পর আমাদের ওপর হামলা চালানোর আশঙ্কা থাকে।


আদাবর থানা সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যায় আদাবর ১৭ নম্বর রোডে অ্যামব্রয়ডারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রায়হান জহিরের কারখানায় হামলা চালানো হয়। ভিকটিম জহিরের ভাতিজা মারুফ হাসান সুমন জানান, রাসেল ওরফে কালা রাসেল নামের স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য তার চাচার কাছে ঈদ উপলক্ষে চাঁদা দাবি করে। তিনি তা দিতে অস্বীকার করায় সন্ধ্যায় রাসেলের নেতৃত্বে ৮-১০ জন কিশোর গ্যাং সদস্য তার কারখানায় হামলা চালায়। এ সময় কারখানার দুই শ্রমিককে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে।


এরপরই হামলার ঘটনায় বিচার দাবিতে রাত ১১টায় আদাবর থানা ঘেরাও করেন অ্যামব্রয়ডারি মালিক ও শ্রমিকরা। তারা থানার সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুর রহমান জানান, কিশোর গ্যাং এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কারখানায় হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত রোহান খান রাসেল, মারুফ, হাসান, রায়হান এবং রোমানসহ অন্তত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী নবীর কোনো যোগসাজশ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ আস্তানা বানিয়েছে আদাবরের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ঢাকায় কোনো অপরাধ সংগঠনের পর পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসব আস্থানায় অভিযান চালিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী বেলচা মনিরসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যরা হলেন- রাকিব হাওলাদার ওরফে ছোট রাকিব, গোলাম রব্বানি ওরফে সাহস, মনির হোসেন ওরফে গুজা মনির ও আকাশ খাঁ। জানা যায়, আদাবরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টায় রিপন ওরফে নিপুকে তার নিজ বাড়িতে বেলচা মনির ও তার গ্রুপের সদস্যরা সামুরাই দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। তাৎক্ষণিক তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে ওইদিন বিকালে মারা যায়।