বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্পট সেন্ট মার্টিনের পর্যটন এখন ধুঁকছে। বিভিন্ন বিধিনিষেধের মারপ্যাঁচে সম্ভাবনাময় এ পর্যটন স্পটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জাহাজ মালিক থেকে শুরু করে হোটেল ব্যবসায়ীসহ এই দ্বীপের পর্যটনের সঙ্গে জড়িতদের গত মৌসুমে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। দীর্ঘ ৯ মাস পর সেন্ট মার্টিন ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু জাহাজ মালিকদের জাহাজ না ছাড়া ও পর্যটকদের দীর্ঘ ব্যয়বহুল যাত্রার পর রাতযাপনের সুযোগ না থাকায় দ্বীপে এই মৌসুমের শুরুতেই ভ্রমণের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছেন পর্যটকরা। ফলে দ্বীপটি খোলার পরও নভেম্বরে পর্যটকশূন্য থেকে যাচ্ছে। এমনটি হলে চলতি মাসে আরও ১০০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বর মাসের আগে দ্বীপটিতে পর্যটকদের যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন।

সম্প্রতি কক্সবাজার গিয়ে সেন্ট মার্টিনের বেশ কয়েকজন পর্যটন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, গত মৌসুম ও চলতি মৌসুমের দুই মাস কোনোরকম ব্যবসা চালালেও এর পরের মৌসুম থেকে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। এতে দ্বীপের প্রচুর মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দীর্ঘ ৯ মাস পর সেন্ট মার্টিন খোলা হলে সরকার জানাল ইনানী থেকে নয়, নুনিয়ারছড়া থেকে জাহাজ ছাড়া যাবে। অথচ নুনিয়ারছড়ায় মাঝেমধ্যে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা জাহাজ আটকে থাকে। এখানে ড্রেজিং নেই। দ্বীপে যেতে-আসতে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা লাগলে পর্যটকরা এক-দুই ঘণ্টার জন্য কেন সেন্ট মার্টিন যাবেন। ইনানী থেকে ছাড়লে পর্যটকরা আরেকটু বেশি সময় দ্বীপে থাকতে পারতেন। মৌসুমে সেন্ট মার্টিনে যায় ৬ থেকে ৭টি পর্যটকবাহী জাহাজ কিন্তু এর একেকটি জাহাজ ৭০০ থেকে ৮০০ যাত্রী বহন করতে পারলেও মাত্র ২ হাজার যাত্রী দ্বীপে থাকার সুযোগ পাবেন বলে সরকার নির্দেশনা দেয়কিন্তু এত কমসংখ্যক যাত্রী নিলে জাহাজগুলোর জ্বালানি খরচও উঠবে না।

ভরা মৌসুমে যেখানে সেন্ট মার্টিনের কোনো হোটেল-রিসোর্টে রুম সহজে পাওয়া যেত না এখন সব প্রস্তুতি নিয়েও দ্বীপের ২০০টির ওপর রিসোর্ট ও হোটেল খালি পড়ে আছে। এসব হোটেল ও রিসোর্ট মালিকদের কেউ কেউ এখন নিজেদের এসব সম্পত্তি বিক্রি করার চিন্তাভাবনা করছেন। স্যান্ড ক্যাসেল বিচ রিসোর্টের এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ভরা মৌসুম থাকলেও জাহাজ চালু না থাকার কারণে পর্যটকরা কেউ বুকিং দিচ্ছেন না। দুই মাসে এমনিতেও তাদের লাভ হয় না। আর রিসোর্টে ১৫ থেকে ২০ জন স্টাফ। পর্যটন মৌসুমে কাজ থাকলেও বাকি সময় তাদের বেতন দিতে হয়। কিন্তু মাত্র দুই মাসের ব্যবসা করে গত মৌসুমে পুরো বছরের বেতন দিতে পারেননি এই রিসোর্টের মালিক।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পরিবেশ ও পর্যটন রক্ষা উন্নয়ন জোটের চেয়ারম্যান শিবলুল আজম কোরেশি বলেন, আমরা ধারণা করছি গত মৌসুমে কম করেও সেন্ট মার্টিনে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। আর নভেম্বর মাসে পর্যটক না গেলে আরও ১০০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা আছে। গত মৌসুমে অতি কষ্টে এ অবস্থা সামাল দেওয়া গেলেও আসছে দিনে আর সামাল দেওয়া যাবে না। জাহাজ মালিকরা লাভ না হলে ডিসেম্বরের আগে জাহাজ ছাড়বেনও না। চলতি মাসে পর্যটক আর যাবেন বলেও মনে হচ্ছে না। সরকার যে ১২টি নির্দেশনা দিয়েছে তা আমরা মানতে রাজি। সেন্ট মার্টিনের পর্যটন এখন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এই মৌসুমে দুই মাস কোনোরকম চালালেও পরের মৌসুম থেকে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন।