রাজধানীর সড়কে নামলেই চোখে পড়ে বিশৃঙ্খল অবস্থা। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় রাস্তায় বাসের রেষারেষি নিত্য চিত্র। ভাড়া নিয়ে বাসের হেলপারের সঙ্গে যাত্রীর বাগ্বিতণ্ডা লেগেই থাকে। দুই বাসের চাপায় হাত হারানো, যাত্রী তুলতে ফুটপাতে উঠে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া কিংবা ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়েছে; কিন্তু শৃঙ্খলা ফেরেনি নগরের গণপরিবহনে। পরিবহনব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে কয়েকটি রুটে চালু হয়েছিল লাল সবুজ নগর পরিবহন বাস, গোলাপি রঙের বাস। কিন্তু এর কোনোটাই টেকসই হয়নি। ২০১৬ সালে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস নামানো নিয়ে কাজ শুরু হলেও ১০ বছরেও তা সফলতা পায়নি। ব্যর্থ হয়েছে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর সব চেষ্টা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘গণপরিবহনে আধুনিকায়ন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত উন্নয়নে নজর দিতে হবে। প্রথমে অগ্রাধিকার দিতে হবে পথচারীদের, এরপর গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে অনুৎসাহিত করতে গণপরিবহনকে যুগোপযোগী করতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন ৪০টি নতুন গাড়ি নামছে রাস্তায়। রাস্তা না বাড়লেও গাড়ি বাড়ছে প্রতিদিন। এতে যানজট বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় গাড়ি মাত্র ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার যেতে পারছে। রাস্তা না বাড়িয়ে ডবল ডেকার বাসে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যেতে পারে। সড়ক পরিবহনে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবহনব্যবস্থা এক ছাতার নিচে কেউ কখনো আনতে পারেনি।’

জানা যায়, রাজধানীতে অনুমোদিত বাস রুটের সংখ্যা ৩৮৮টি। এর মধ্যে এখন অকার্যকর ২৭৮টি। সক্রিয় ১১০টি রুটে অনুমোদিত গাড়ির সংখ্যা ৭ হাজার ৪৩টি, অথচ গাড়ি চলছে ৪ হাজার ৫৪৬টি। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৫৩টি। ৫০টি বাস কোম্পানির ২ হাজার ৮৮৫টি বাস চলাচলের অনুমতি রয়েছে। এতে ২০ বছরের অর্থনৈতিক মেয়াদকাল ফুরানো বাসের সংখ্যা ৭০৪টি। রুট পারমিট রয়েছে ১ হাজার ৬৫৫টি বাসের।

এ হিসাব অনুযায়ী, ৫০ জন বাসমালিকের ১ হাজার ২২০টি রুট পারমিটবিহীন বাস ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে বাস পরিবহন সেবা পরিচালনা ও বিশেষ অধিকার (রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ) আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর লক্ষ্য হলো অপারেটরদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে যাত্রীসেবার মান বিবেচনায় কোম্পানিভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা।’

এ ছাড়া ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) পরিকল্পনার বাইরে পৃথকভাবে কোনো রুট পারমিট অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

এর মধ্যে নতুন করে রাজধানীর বাস রুট বিন্যাস নিয়ে পরিকল্পনা চলছেবাতিল হতে যাচ্ছে রাজধানীর ৩৮০টির বেশি বাস রুটনতুন ২৭টির খসড়া তালিকা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বাস্তবায়ন হলে প্রথমবারের মতো যাত্রীরা সুযোগ পাবে নগরীর দুই প্রান্তে ট্রানজিটহীন যাত্রারযদিও এসব রুটের বিষয়ে সংযোজন ও সন্নিবেশিত করার সঙ্গে আরও ১৫টি রুট বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি। সবার প্রস্তাব নিয়ে নতুনভাবে বাস রুট নির্ধারণের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে ডিটিসিএ। এর বাইরে বৈদ্যুতিক বাস নামানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড (পিটিএফ) গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। এর লক্ষ্য বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রিক বাস নামানোর জন্য অর্থায়ন করা ও এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট ফেজ-১-এর আওতায় ডিটিসিএ এ তহবিল গঠন করবে। এর মাধ্যমে প্রথমে ঢাকায় ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস নামানো হবে। পরে অন্যান্য বড় শহরেও এ উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বাস পরিচালনাকারীদের আর্থিক অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা এবং সেবার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হবে।

প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী, এ পরিবহন তহবিলে মূলধন হিসেবে ৪২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে। নতুন এ ব্যবস্থায় বাস অপারেটরদের নির্দিষ্ট হারে ফি দেওয়া হবে। ভাড়া নির্ধারণ, রাজস্ব আদায় ও যাত্রীর চাহিদা কমবেশি হওয়ার সব ধরনের ঝুঁকির দায়িত্ব নেবে সরকার।