ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতি। বিভিন্ন দলের নেতারা এ ঘটনায় সভাসমাবেশ করে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

মির্জা আব্বাস : হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিকেলে দেখতে গেলে যারা মব সৃষ্টি করেছে, তারা হাদির মৃত্যু কামনা করেছিল। হাদির ওপর বর্বরোচিত এ হামলা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। এ আঘাতকে প্রতিহত করতে হবে। অপশক্তির কালো হাত ভেঙে দিতে হবে।

ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত’ দাবি করে মির্জা আব্বাস বলেন, হাদির ওপর হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে একটি বাড়ির ইট খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তারা চেয়েছিল হাদি মারা যাক। তার ওপর হামলায় আমি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। হাদির ওপর হামলার পর তাকে দেখতে হাসপাতালে গেলে আক্রমণাত্মক স্লোগান দেওয়া হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তৃতায় হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, হাসপাতালে যারা মব সৃষ্টি করেছিল, তারা হাদির সমর্থক নয়, তারা বিশেষ রাজনৈতিক দলের লোক। এ দলটি সব সময় ষড়যন্ত্র করে এসেছে। আমার নির্দেশনা পেলে, তাদের তুলাধোনা করত আমাদের ছেলেরা। মুসলমানের লেবাসধারীরা হাদির মৃত্যু কামনা করছে।

সমাবেশে বিএনপির অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতারাও বক্তব্য রাখেন। বক্তারা অবিলম্বে হাদির ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

রুহুল কবির রিজভী : গতকাল সকালে বিএনপির ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচির আলোচনা সভায় বক্তৃতায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তো নিরপেক্ষ সরকার। এই সময়ে এত সন্ত্রাসীর উত্থান কেন ঘটবে? আজ পাড়া-মহল্লায় এত সন্ত্রাসী-এটা কীসের জন্য? সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। মানুষ নানাভাবে নানান কথা বলছে। কোথা থেকে এত সন্ত্রাসী রাজত্ব করছে? এখন তো আরও শান্তিপূর্ণ সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের বসবাস করার কথা।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতে করার কথা। সেটি কি কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে বিনষ্টের চেষ্টা করছে, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?’ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপিকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ কেউ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিচ্ছে। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দল বিএনপিকে লক্ষ্য করে ফেসবুকে বার্তা দিচ্ছে। এগুলো সন্দেহ সৃষ্টি করে। একজন উপদেষ্টা মাত্র চার-পাঁচ দিন আগে বলে দিলেন, জনগণ তো আমাদের ম্যান্ডেট দেয়নি-কত দিন থাকব। সবকিছু মিলিয়ে নানা সন্দেহ, সংশয় ও কৌতূহল তৈরি হচ্ছে।

রাশেদ খান : গতকাল রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের উদ্দেশে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তিনি দাবি করেন, ওসমান হাদিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা গুলি করেছে। নির্বাচন কেন্দ্র করে ৫০ জন প্রার্থীকে টার্গেট করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরা। তার অংশ হিসেবেই ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়েছে। এই দুর্বৃত্তরা তার সঙ্গে বন্ধু হিসেবে মিশেছে, তার অফিসে অনেকবার গেছে।

তিনি বলেন, ওসমান হাদি যদি আমাদের মধ্যে ফিরে না আসে, তাহলে তার জবাবদিহি সরকারকে দিতে হবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কোনোভাবেইঘটনার দায় এড়াতে পারেন নাআমরা মনে করি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করতে পারবে নাসরকার যদি আগামীতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সরিয়ে দেওয়া

মামুনুল হক : গতকাল রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, যারা হাদিকে হত্যা করে বাংলাদেশকে ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিল, তাদের একটি বার্তা দিতে চাই- এক হাদিকে যদি হত্যা করা হয় তার চেতনা বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হবে। একটু জাগ্রত করার চেষ্টা করেন তাহলে হয়তো আগামীর বাংলাদেশ বেঁচে যাবে। বাংলাদেশ যদি বেঁচে যায় হাদিরা বেঁচে থাকবে। মামুনুল হক বলেন, আমি শপথ করতে চাই, হাদি যে চেতনাকে ধারণ করেছেন আমরাও যদি আমাদের হৃদয়ে সেই চেতনা ধারণ করতে পারি তাহলে আমাদের এই প্রার্থনা, এই বক্তব্য স্বার্থক হবে।

নাহিদ ইসলাম : গতকাল দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচনবিরোধী ছকের অংশ। ভারত আওয়ামী লীগকে দিয়ে ওসমান হাদিকে গুলি করিয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারতের সহায়তায় মূলত এ হামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে। হাদির ওপর হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আওয়ামী লীগের নির্বাচনবিরোধী ছকের অংশ। উল্লেখ্য, এদিন সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈঠকে তিনটি দলের দুজন করে প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন।

ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তি গুলি করেছে : হাদির ওপর হামলা ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির’ প্রভাবে হয়েছে বলে দাবি করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, ‘হাদিদের শেষ নাই। যারা জুলাইকে বিপ্লব মানতে চান না, তারা দিল্লির গোলামি করতে চায়, দুর্নীতি করতে চায়। এ সুশীলরাই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। হামলাকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবিও জানিয়েছেন। হাদির ওপর হামলার ঘটনায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের সড়কে ‘বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাবেশ ও গণপ্রতিরোধ’ শীর্ষক সমাবেশে এসব কথা বলেন তারা। আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। সমাবেশে মাহমুদুর রহমান বলেন, হাদির ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে ১৫ তারিখ এ সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে দেশের আপামর মানুষ। অনুষ্ঠানে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমার হাদি ভাইয়ের রক্তের শপথ, বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য কোনো ফর্মে

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ : ঝিনাইদহ : সন্ধ্যায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নতুনভুক্ত মালিথিয়া গ্রামে বারোয়ারি পূজামন্দিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজনে বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাদির ওপর হামলাকারীর শিকড় যতই শক্তিশালী হোক না কেন তা টেনে উপড়ে ফেলা হবে। এ ছাড়া হাদিকে গুলির প্রতিবাদে বিএনপির উদ্যোগে গতকাল ঝালকাঠি, কক্সবাজার, বরিশাল, সিলেট, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লালমনিরহাট, গোপালগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, মুন্সিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, সমাবেশ করা হয়।

হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলায় সুজনের উদ্বেগ : শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক। গতকাল সুজন চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন ও সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তারা বলেন, এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা দেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বিপজ্জনক। বিবৃতিতে বলা হয়, শরিফ ওসমান হাদির দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি, তার পরিবার ও সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা জানাচ্ছি।

এবং অবিলম্বে শরিফ ওসমান হাদির সর্বোত্তম চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তার ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সব প্রার্থী, দলীয় কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।