বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন গতি পেতে যাচ্ছে। এর আগে চেষ্টা করেও এ কাজে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আজ সচিবালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সমুদ্রের ২৬টি অফশোর ব্লকে জ্বালানি অনুসন্ধানের জন্য এ দরপত্র প্রকাশ করা হবে। জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে এবার দরপত্রের শর্ত আগের চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগবান্ধব ও আকর্ষণীয় করা হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগের বেশি পার হলেও সমুদ্রসীমায় জ্বালানি অনুসন্ধানে কোনো সাফল্য অর্জন করা যায়নি। অথচ প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তান সমুদ্রে জ্বালানিসম্পদ আবিষ্কারে বহুদূর এগিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ৫৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সে বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার এসে আরও তিন মাস বৃদ্ধি করে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকটি কোম্পানি সমুদ্রে বহুমাত্রিক জরিপের তথ্য কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্রে অংশ নেয়নি। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ১ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর। এর মধ্যে আগ্রহী বিদেশি কোম্পানিগুলো বঙ্গোপসাগরের জরিপ তথ্য ও কারিগরি উপাত্ত সংগ্রহ করে দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশে ও বিদেশে রোড শো, সংবাদ সম্মেলন এবং বিভিন্ন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে। পেট্রোবাংলার প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টের (পিএসসি) পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (আজ) সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছি। এ বিষয়ে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। এবার পিএসসিকে আরও আকর্ষণীয় করা হয়েছে। গতবারের চেয়ে এবার বেশি বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে ভালো সাড়া আশা করছি। এবার অয়েলের মূল্য বাড়িয়েছি। এর সঙ্গে নতুন করে পাইপলাইন ট্যারিফ সংযোজন করেছি। পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্তে আরও নমনীয়তা আনা হয়েছে। ঈদের ছুটির পর প্রথম কার্যদিবসেই আমরা দরপত্র বিক্রি শুরু করব। আমাদের পরিকল্পনা আছে দরপত্র প্রচারের জন্য রোড শো আয়োজনের। এরপর মন্ত্রণালয় যেভাবে নির্দেশনা দেবে সেভাবে সব আয়োজন করব।’ জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এ অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনুসন্ধান পর্যায়ে আগের মতো ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দিতে হবে না। এখন কোম্পানিগুলো মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা ত্যাগ করবে। গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে উচ্চ সালফার অয়েলের দামের ভিত্তিতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হলেও এখন তা ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম নির্ধারণ হবে তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ পর্যন্ত। পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘গতবার আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকার পরও কী কারণে এটি ব্যর্থ হয়েছিল, তার কারণ নিশ্চিয়ই এরই মধ্যে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্টরা বের করতে পেরেছেন। তাঁদের জানার কথা কী করলে এখানে বিড পড়বে আর কী করলে পড়বে না। এ ব্যাপারে আমাদের বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন যারা সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করছেন তারা ভালো লাভ না হলে এখানে আসতে চাইবেন না। পৃথিবীর তিন-চারটি স্থানে বড় বড় গ্যাস ফিল্ড পাওয়া গেছে। আমরা এ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কী দামে গ্যাস কিনব তা যেন ভালোভাবে উল্লেখ থাকে। এটা যেহেতু গভীর অফশোর। এ স্থান থেকে গ্যাস আনার বেশ কিছু ঝামেলা আছে। এগুলোও নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্টরা খতিয়ে দেখেছেন। এবার নিয়ে তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। এবারও সফল না হলে তা দেশের জন্য খুব খারাপ হবে। পৃথিবীতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এখন গ্যাস অনুসন্ধানের অনেক বিকল্প আছে। এ কোম্পানিগুলো আমাদের মতো ছোট জায়গায় কাজ করতে খুব একটা আগ্রহী হবে না। এজন্য সব বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’