স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার কোনো ইচ্ছা শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না। তাই ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্র্যাকডাউন (অপারেশন সার্চলাইট) শুরুর আগে তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধ সত্ত্বেও স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি তিনি। তাজউদ্দীন সাহেব শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে, মানুষ স্বাধীনতা চায়। কিন্তু শেখ সাহেব তখন বলেছিলেন, আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না, পাকিস্তান ভাঙতে আমার কোনো ভূমিকা থাকুক এটি আমি চাই না। সুতরাং তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। স্পিকার আরও বলেছেন, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করত, তাহলে এ দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ নয়, এটি ছিল একটি জনতার যুদ্ধ। গতকাল রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) আয়োজিত ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। স্পিকার বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সেই প্রতিরোধই পরবর্তীকালে মুক্তিবাহিনীতে রূপ নেয় এবং সাধারণ মানুষ, ছাত্র-যুবক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের অংশগ্রহণে একটি সর্বজনীন মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। তাই ইতিহাসের সত্য হলো, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টই মুক্তিবাহিনীর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।


স্পিকার বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে যখন জাতি দিশাহারা ও অবদমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিল, এটিই হলো প্রকৃত সত্য। হাফিজ উদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় এসে একটি বিশেষ গোষ্ঠী ইতিহাস বিকৃত করে শুধু ৭ মার্চের ভাষণের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতার কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিল, যা ছিল চরম অন্যায়। রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব হাইজ্যাক করেন এবং নিজের দলের নেতাকে ছাড়া কাউকে কৃতিত্ব দিতে চান না। আলোচনায় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানে রেজিমেন্টের মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। একেকটি ক্যান্টনমেন্টে তারা কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা যোগাযোগ ছাড়াই পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে বিদ্রোহ করে এবং জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়। এই প্রতিরোধ যুদ্ধই ছিল ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, দেশের সমৃদ্ধি ও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে একাত্তরে যাদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাদের অকপটে সেই দায় স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মন্ত্রী বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চাই, সমৃদ্ধ করতে চাই। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। অনুষ্ঠানে রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হকের সভাপতিত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত সদস্য ও অফিসাররা বক্তব্য দেন।